বাঁশবাড়িয়া, গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত ও মহামায়া লেক ভ্রমণের গল্প !

বাঁশবাড়িয়া, গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত ও মহামায়া লেক ভ্রমণের গল্প !

দিনটি ছিল ১৫ ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার! এর পরের দিন ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। রাত ১০ টা ৩০ মিনিট! গড়বো কাপাসিয়ার উদ্দ্যোগে আয়োজিত ভ্রমণের সদস্যরা শিববাড়ি শ্যামলি পরিবহনে যাত্রা শুরু করলাম। যাত্রা পথে কুমিল্লা একটি হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে যাত্রাবিরতীতে সবাই ফ্রেস হয়ে চা/কফি পান করে নিলাম। আবার শুরু হল আমাদের যাত্রা। ভোরবেলা আমরা পৌছে গেলাম বাঁশবাড়িয়া বাস স্ট্যান্ড। তখনো সূর্যি মামা জেগে উঠেনি। আমরা সবাই একসাথে ফজরের নামাজ পড়ে নিলাম। ফোন দিলাম গড়বো কাপাসিয়ার প্রধান উপদেস্টা সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী ভাইকে। কিন্তু ওনি দুঃখ প্রকাশ করলেন। ঢাকায় বেশ কিছু ব্যস্ততার কারনে আসতে পারবেন না। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। যিনি সব সময় আমাদের টুর গুলোতে মধ্যমনি হয়ে থাকেন। ওনাকে ছাড়া কোন টুর যেন জমেই না কোনভাবে মনকে মানিয়ে নিলাম।

স্থানীয় একজন ভাই এর সাথে আগেই কথা হয়েছিল। ওনাকে ফোন দিলাম। ওনি আসার আগ পর্যন্ত সবাই বাঁশবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড একটু হাটাহাটি করে নিলাম। এই ফাঁকে আমরা হালকা নাস্তা করে নিলাম। (বিঃ দ্রঃ বাঁশবাড়িয়া তেমন ভাল কোন খাবারের রেস্টুরেন্ট নেই। যা পেয়েছি তাতেই আমাদের চলে গেছে)।

এর পর স্থানীয় অই ভাইটি (কাউসার ভাই) চলে আসলো। ওনি আমাদের জন্য সি এন জি ম্যানেজ করে দিলো। আমরা ২ টি সি এন জি তে করে বাঁশবাড়িয়া সী বীচের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। এখান থেকে জনপ্রতি ভাড়া ২০ টাকা (স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত)। ব্যাপার টা ভাল লাগছে। কেউ বেশি ভাড়া নেওয়া সুযোগ নেই। পৌছে গেলা বাঁশবাড়িয়া সী বীচে সকাল ৭ টার দিকে। সেখানে গিয়ে উঠে গেলাম সেই ব্রীজে যা ছবিতে দেখেছিলাম। সমুদ্রের উপর করা এই ব্রীজ দিয়ে মূলত সন্দীপ যাওয়া হয়।( স্পীড বোটে)। এই ব্রীজে উঠলে ১০০ টাকা করে নেয়। বিনিময়ে স্পীড বোটে আপনাকে ঘুড়াবে। স্পীড বোটে না উঠলেও ১০০ টাকা দেওয়া লাগে। আমরা খুব সকাল সকাল চলে গিয়েছিলাম বিধায় অই ১০০ টাকা লাগেনি। সম্ভত সকাল ৯ টার পর থেকে আর কাউকে ফ্রী উঠতে দেয়না। ব্রীজে উঠে সবাই ছবি উঠালাম।

বাঁশবাড়িয়া
বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতের ব্রীজ

এই মধ্যেই আমাদের সাথে যোগ দিলেন আমাদের টুরের অন্যতম সদস্য মুনাব্বির ভাই। অনেক ঝক্কি ঝামেলা পেরিয়ে সেই কুয়াকাটা থেকে এসে আমাদের সাথে যোগ দিলেন।

একটু দূরেই দেখা যাচ্ছিল মনকাড়া ঝাউবন ও বিস্তির্ণ সবুজ উদ্দ্যান। মন সায় দিল দেখানে যেতে। আমাদের গাইড করে সেখানে নিয়ে গেলেন প্রিয় কাউসার ভাই (স্থানীয়)। সেখানে সবুজ ঝাউবন ও বিস্তির্ণ ময়দান দেখে মন ভরে গেল। সবাই গ্রুপ ছবি, সিংগেল ছবি উঠালাম। এবার ফেরার পালা। বেশ কিসুক্ষন সময় এখানে কাটিয়ে আমরা সি এন জি করে চলে এলাম বাঁশবাড়িয়া বাস স্ট্যান্ড।

বাঁশবাড়িয়ার ঝাউবন
বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতের ঝাউবন

সেখানে হালকা টিফিন করলাম (ঝালমুড়ি)। এর পর আমরা লোকাল বাসে উঠে চলে গেলাম সীতাকুন্ড বাজার। (বাস ভাড়াঃ ১০ টাকা)। উদ্দেশ্য বহুল প্রত্যাশিত গুলিয়াখালি সী বীচ। সেখানে দেখা হল প্রিয় তসলিম উদ্দিন ভাইয়ের সাথে (স্থানীয়)। সীতাকুন্ড থেকে সি এন জি দিয়ে চলে গেলাম গুলিয়াখালি সী বীচ। একটি সি এন জির ভাড়া ছিল ১০০ টাকা (৫ জন যাওয়া যায়)। সকাল ১১ টা নাগাদ পৌছে গেলাম গুলিয়াখালি সী বীচ। হাটা শুরু করলাম বীচের উদ্দেশ্যে। ভয়ে ছিলাম কাদা মারাতে হয় কিনা! ভিডিও তে দেখেছিলাম কিভাবে ট্রাভেলাররা হাটু কাদা মাড়িয়ে সেখানে যায়। আমাদের ভাগ্য ভাল ছিল। বৃষ্টি না হওয়ায় কাদা মারাতে হয়নি। শুকনা ছিল রাস্তা। ৫-৬ মিনিট হেটে চলে পৌছে গেলাম বহুল প্রত্যাশিত গুলিয়াখালি বীচে। যত সামনে আগাচ্ছিম আর মুগ্ধ হচ্ছিলাম সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি দেখে। চারদিকে সবুজের সমারোহ। মাটিতে শ্বাসমূল থাকায় অনেকটা সুন্দরবনের মত মনে হচ্ছিল। খানিকটা হেটে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিলাম। ছবি তুললাম। মন চাচ্ছিল সবুজ গালিচায় শুয়ে থাকি লম্বা সময়।

গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত
গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত

বেশ কিছুক্ষন কাটিয়ে বিদায় নেওয়ার পালা। কিন্তু মন চাচ্ছিল না ফিরে যেতে।। তারপর সিদ্বান্ত নিলাম আমরা কয়েকজন বীচে গোসল করবো। যদিও এই বীচ টা গোসলের জন্য এত ভাল না। শ্বাস মূল থাকায় হাটতে কষ্ট হয়। আমরা ৪ জন কিছুই তোয়াক্কা না করে নেমে গেলাম সমুদ্রে। বেশ কিছুক্ষন সুমুদ্রে কাটিয়ে উঠে আসলাম। পানি ছিল অসম্ভব রকমের ঠান্ডা। এবার হাল্কা বিশ্রাম নিয়ে ফেরার পালা। সত্যি বলতে আমার এখান থেকে তখনো ফিরতে মন চাচ্ছিল না। মন চাচ্ছিল সন্ধ্যা পর্যন্ত সমুদ্রের পাশে এই সবুজ গালিচায় শুয়ে থাকি। কিন্তু আমাদের তখন উদ্দেশ্য ছিল বিকেল টা কাটাবো মহামায়া লেকে।

গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত
গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকতে গড়বো কাপাসিয়ার সদস্যরা

আবার একটু হেটে সি এন জির কাছে চলে আসলাম। একটু পর পর সি এন জি পাওয়া যায়। পাশের একটি মাত্র টং দোকান থেকে সবাই কলা, চা, পানি পান করলাম। এর পর সি এন জি পাওয়া মাত্র রওনা দিলাম সীতাকুন্ড বাজারের উদ্দেশ্যে। আসার ভাড়া ১০০ টাকা হলেও যাওয়ার ভাড়া বেশি নেয়। ১৫০ টাকা নিয়ে ছিল প্রতি সি এন জি।

সীতাকুন্ড এসে নামাজ পড়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। খাওয়া শেষে স্থানীয় প্রিয় কাউসার ভাই ও তসলিম উদ্দিন ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লোকাল বাসে করে মহামায়া লেকের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাউসার ভাই অনেক হেল্প করেছিলেন। বিদায় নিতে মন চাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল আমাদের টুর গ্রুপেরই একজন সদস্যকে মাঝপথে বিদায় দিচ্ছি। অনেক দিন মনে থাকবে ওনার আর প্রিয় তসলিম উদ্দিন ভাইয়ের আন্তরিকতা। আমরা বাস থেকে নামলাম ঠাকুর দিঘি। সেখানে অপেক্ষা করছিলেন গাজীপুর ডুয়েটে অধ্যায়ন রত স্থানীয় মুন্না ভাই। ওনি সি এন জি ঠিক করে দিলেন। সবাই সি এন জিতে করে চলে আসলাম মহামায়া লেক। ভাড়া জন প্রতি ১৫ টাকা। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে ছুটির দিন হওয়ায় লেকে অনেক ভীড় ছিল।

মহামায়া
মহামায়া লেকের পাহাড়ে

আমরা লেকের পাশের পাহাড়ে একটু ঘুড়াগুড়ি করে ছবি তুললাম। এর পর পড়ন্ত বিকেলের লেকে ঘুড়ার জন্য একটা বোট ঠিক করলাম। পুরো লেক ঘুরিয়ে দেখাবে। ১৫০০ টাকা নিয়েছিল। আমরা ছিলাম স্থানীয় কয়েকজন সহ ১৫ জন। লেকের সৌন্দর্যে আমাদের গ্রুপের সবাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যার দিলে বোট দিয়ে ঝর্ণার কাছেও গিয়েছিলাম। শীতকাল হওয়ায় তেমন পানি ছিল না। এর পর ঘুড়াগারি শেষ করে রওনা দিলাম ঠাকুর দিঘির উদ্দেশ্যে।। সি এন জি করে। ভাড়া ছিল জন প্রতি ১৫ টাকা।

দুইপাশে উচু পাহাড় বেস্টিত মহামায়া লেকের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা
মহামায়া লেকে সূর্যাস্ত

এর পর সেখান থেকে লোকাল বাসে করে চলে গেলাম বারৈয়ার হাট। সেখান গিয়ে কাউন্টারে চলে গেলাম। মুন্না ভাই আগেই টিকেট বুকিং করে রেখেছিলেন। ছুটির দিন হওয়ায় সরাসরি গাজীপুরের টিকেট পাইনি। স্টার লাইনের আব্দুল্লাহ পুরের টিকেট পেয়েছিলাম। টিকেট কনফার্ম করে সবাই নামাজ পরে, বিশ্বাম নিয়ে রাতের খাওয়া দাওয়া করে রাত ১১ টায় বাসে উঠে পড়লাম। মুন্না ভাইকে বিদায় দিয়ে গাজীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বিদায় বেলা মুন্না ভাই ওনার লেখা কবিতার সংকলন উপহার দিলেন। ভাল লাগলো ওনার উপহার পেয়ে। ভোর ৪ টা ৩০ এ টংগি চলে আসলাম। সেখান থেকে পেয়ে গেলাম গাজীপুরের বলাকা। বলাকায় চড়ে ভোর ৫ টার মধ্যেই গাজীপুর চৌরাস্তা চলে আসলাম। সেখান থেকে লেগুনা + রিকসায় চড়ে সবাইলে বিদায় জানিয়ে সূর্যি মামা জেগে উঠার আগেই চলে আসলাম বাসায়। এভাবেই শেষ হল আমাদের গড়বো কাপাসিয়ার আরো একটি স্মরনীয় ভ্রমণ।

[ ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, গাজীপুর ]

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *