মহেশখালি ও সোনাদিয়া দ্বীপ ভ্রমন!

মহেশখালি ও সোনাদিয়া দ্বীপ ভ্রমন!

মার্চ ২০১৬! বাংলাদেশে ভ্রমণের জন্য অফ সীজন বলা যায়! আর এই অফ সীজনই আমার জন্য ভ্রমণের উপযুক্ত যময়। বেশ কিছুদিন আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল কক্সবাজারে একটা রিলাক্স টুরে যাবো। রুমমেট মোয়াজ্জেম আকন্দ ভাইকে সাথে নিয়ে আলাপ আলোচনা করে ঠিক করলাম, টুরটা একটু অন্যরকমভাবে করতে চাই। বাসে তো অনেক গেলাম কক্সবাজার। এবার ঠিক করলাম আকাশ পথে প্লেনে যাবো। এছাড়া এর আগে কখনো প্লেনে চড়া হয়নি। মোয়াজ্জেম ভাইয়ের এক আত্মীয় এয়ারপোর্টে চাকরি করেন। ওনাকে ফোন দিলাম টিকেট ম্যানেজ করে দেওয়ার জন্য। ওনি অনলাইনে টিকেট কেটে আমাকে মেইল করে দিলেন। দুইটা টিকেট ১০,৪০০ টাকা নিয়েছিল।

১২ মার্চ ২০১৬! আমাদের পূর্বনির্ধারিত ভ্রমণের তারিখ। দুপুর ১২ টায় আমাদের ফ্লাইট। যেহেতু প্রথমবারের মতো প্লেনে চড়বো তাই অন্যরকম একটা উত্তেজনা কাজ করছিল। সকাল ১০ টায় জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্ধরে পৌছে গেলাম। কোন টার্মিনাল দিয়ে প্রবেশ করবো পূর্বে কোন আইডিয়া ছিল না। দুইজন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল ১ এর রোড দিয়ে হাটা শুরু করলাম। কিন্তু গেইটে যাওয়ার পর সিকিউরিটি জিজ্ঞেস করলো, পাসপোর্ট দেখিতো! যাবেন কোথায়? বললাম কক্সবাজার যাবো। শুনে বললো এখানে আসলেন কেন? দূরে নিচের দিকে দেখিয়ে দিলো ডোমেস্টিক টার্মিনালে যাওয়ার জন্য। নির্দেশনামত চলে গেলাম ডোমেস্টিক টার্মিনালে। প্রবেশ করার পরই দেখি ইউ এস বাংলা এয়ার লাইন্স এর টিকেট কাউন্টার। সেখান থেকে অনলাইন প্রিন্ট কপি দেখিয়ে মূল টিকেট নিলাম।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে

তারপর ইমিগ্রেশনে গিয়ে ব্যাগ চ্যাক করিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। সেখানে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম আমাদের ফ্লাইটের জন্য। দেরি দেখে ওয়াসরুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে নিলাম। কোন এক কারনে আমাদের ফ্লাইট ৩০ মিনিট লেট। স্পীকারে ঘোষনা দিচ্ছিল। আমাদের ফ্লাইটের নাম বলার পর লাইনে দারালাম। গেট দিয়ে প্রবেশ করার পর দেখি আমাদের জন্য নির্ধারিত বাস অপেক্ষা করছে। মূলত বাস দিয়ে প্লেনের কাছে সবাইকে নিয়ে যায়। বাসে উঠে চার পাশের দৃশ্য গুলো দেখছিলাম। বিভিন্ন প্লেন লেন্ড করানো আছে। প্রথম বার হওয়ায় ভাল লাগছিল দেখতে।।

অল্প সময়ের মধ্যেই ইউ এস বাংলার প্লেনের কাছে পৌছে গেলাম। নেমে কিছু ছবি তুলে প্লেনে প্রবেশ করলাম। কেবিন ক্রুকে বলার পর আমাদের সিটের কাছে নিয়ে গেলো। জানালার পাশে বসার কারনে বাহিরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। দেখতে দেখতেই মেঘের উপরে উঠে গেলাম। কিছুক্ষন পর কেবিন ক্রু আমাদের একটা খাবার প্যাকেট ও পানি দিয়ে গেল।

৪০ মিনিটেই পৌছে গেলাম কক্সবাজার বিমানবন্দর। বিমান বন্দরের বাহিরেই অপেক্ষা করছিল আমাদের ইদ্রিস ভাই।

সেখান থেকে চলে গেলান কক্সবাজার কলাতলী সি বিচের পাশেই একটা হোটেলে। হোটেলে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে ইদ্রিস ভাইয়ের এখানে খাওয়া দাওয়া করলাম। তারপর সি বিচে গিয়ে বেশ কিছুক্ষন সমুদ্রে গোসল করে রুমে ফিরলাম বিকেলের সময়টা ইনানী ও হিমছড়ি কাটিয়ে হোটেলে ফিরলাম। রাতের খাওয়া দাওয়া শেষে সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে ছাতার নিচে অনেকটা সময় শুয়ে থাকলাম। কক্সবাজারে এই কাজটাই আমার সব থেকে ভাক লাগে। আহ! কি শান্তি! কি অনুভুতি! রাতে রুমে ফিরে পরের দিনের প্লান করলাম! সিদ্বান্ত নিলাম মহেশখালি দ্বীপ যাবো।

কক্সবাজার কলাতলী সী বীচের পাশে শুয়ে থাকার সেই মূহুর্ত

১৩ মার্চ ২০১৬! সকাল সকাল নাস্তা করে অটো রিকশায় মহেশখালির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। এবার বাকিটা পথ যেতে হবে স্পীড বোটে করে। স্পীড বোটে উঠে চলে গেলাম মহেশখালি। সেখান থেকে সারাদিনের জন্য একটা অটো রিজার্ভ নিলাম ১০০০ টাকায়। অটো রিকশার ড্রাইভার দায়ীত্ব নিলেন সারাদিন আমাদের গাইড করে ঘুরিয়ে দেখাবে। আমাদের প্রথমে নিয়ে যাবে সোনাদিয়া দ্বীপ। সেখানে ঘুরে বিকেলে ফেরার পথে মহেশখালী দেখবো। অটোতে করে চলে গেলাম সোনাদিয়া যাবার ঘাটে। সেখান দরদাম করে নৌকা রিজার্ভ নিয়ে রওনা দিলাম সোনাদিয়ার উদ্দেশ্যে। যতই সামনে এগোচ্ছিলাম চারপাশের ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছিলাম। অনেকটা মিনি সুন্দরবন বলা যায়। পানির মধ্যে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। অপরুপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌছে গেলাম সোনাদিয়া দ্বীপ।

সোনাদিয়া দ্বীপের পথে

নৌকা ঘাটে বেধে হাটা শুরু করলাম সি বীচের উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষন হাটার পর পৌছে গেলাম সোনাদিয়া দ্বীপের সি বিচে। সি বীচ টা দেখে মন ভরে গেল। অনেক সুন্দর ছিল সমুদ্র সৈকতটা। দ্রুত রওনা দিতে হবে! না হয় ভাটা পড়ে যাবে। তখন নৌকা দিয়ে যাওয়া যাবে না। তাই কিছুক্ষন হাটাহাটি করে করে ফেরার জন্য হাটা শুরু করলাম। একটা মসজিদ পেয়ে নামাজ পড়ে হালকা বিশ্রাম নিয়ে নিলাম এই সুযোগে। তখনো দুপুরে খাইনি। ক্ষিধায় পেট চো চো করছিল!

সোনাদিয়া দ্বীপের সমুদ্র সৈকত

এদিকে আমাদের গাইড অটো রিকশার ড্রাইভার আমাদেরকে সোনাদিয়া দ্বীপের একটি বাড়িতে নিয়ে গেল। ওনার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। সেখানে আমাদেরকে দ্বীপের তরমুজ দিয়ে আপ্যায়ন করলেন ওনারা। তরমুজ খেয়ে মনে হল দেহে প্রাণ ফিরে এসেছে। এবার বিদায়ের পালা। নৌকার কাছে এসে দেখি। ভাটা পড়ে গেছে। নৌকার মাঝি অনেক কষ্টে নৌকা শুকনা থেকে পানিতে ঠেলে নামালেন। আমরা একটু এগিয়ে গিয়ে নৌকায় উঠে গেলাম। আবার চলতে শুরু করলো।

 

পড়ন্ত বিকেল বেলা। আমাদের নৌকা চলতে শুরু করলো। কিছুদূর যাবার পর আবার নৌকা আটকে গেল। ভাটা পড়ে যাওয়ার কারনে বিভিন্ন স্থানে শুকিয়ে গেছে। আমাদের গাইড বললো হেটে যাওয়া লাগবে। ক্লান্ত শরীরে উপায় না দেখে হাটা শুরু করলাম সোনাদিয়া টু মহেশখালীর একমাত্র রাস্তা দিয়ে। বলে রাখা ভাল, ভাটার সময় হেটেই দ্বীপে আসা যাওয়া করা যায়। দুই পাশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে গোধুলি লগ্নে পৌছে গেলাম মহেশখালী দ্বীপে।

একদিকে লম্বা পথ হেটে কাহিল অবস্থা! আবার পেটেও ক্ষিধে। চলে গেলাম মহেশখালি দ্বীপের বাজারে। সেখানে গিয়ে হাল্কা নাস্তা করে রওনা দিলাম ঘাটের উদেশ্যে। পথিমধ্যে একটা মন্দির পড়লো। পাহাড়ের উপরে অবস্থান। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় আমরা আর দেরি না করেই ঘাটে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি স্পীড বোট নেই। তখন একটা লোকাল ট্রলারে উঠে অপেক্ষা করতে লাগলাম। এভাবেই শেষ হলো আমাদের সোনাদিয়া ও মহেশখালী দ্বীপ ভ্রমন।

পরেরদিন কুমিল্লা বিশেষ কাজ থাকায় রাতের বাসে কমিল্লা চলে গেলাম। খুব ভোরে কুমিল্লা পৌছে সেখান কাজ শেষ করে সরাসরি গাজীপুর চলে আসলাম।

[ ০২ জানুয়ারি ২০১৮, গাজীপুর ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *