ছোট গল্পঃ রুপমের উপলব্ধি !

ছোট গল্পঃ রুপমের উপলব্ধি !

উফ ! অসহ্য! জীবনটা আর এক মুহুর্তও রাখতে চাইনা। সবার চোখে আমি সম্ভবত  মস্ত বড় এক অপরাধী। এভাবে পরিবার আর সমাজের মানুষের কাছে চক্ষুশূল হয়ে বেচে থাকার কোন মানেই হয় না। জীবনের প্রতি চরম ধিক্কার আর ঘৃণা নিয়ে নিয়ে বাড়ির পাশে পুকুর ঘাটে একা বসে  বিড় বিড় করে নিজের সাথেই কথাগুলো বলতে লাগল রুপম।

পরিবারে পিতা-মাতার আদরের ধন ছিল রুপম। স্কুল লাইফ পারি দিয়ে এখন সে ভার্সিটিতে পড়ে। স্কুলে ফার্স্ট হতে না পারলেও ভাল মেধাবী ছাত্র ছিল রুপম। ক্লাসের অন্য ছেলেদের চেয়ে সে ছিল একটু আলাদা! ছোট থেকেই সে অনেক বড় স্বপ্ন দেখতে ভালবাসত। যদিও অনেকে তার স্বপ্নগূলো নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করত। কিন্তু তাতে কি আসে যায়!

এইতো মাত্র কিছুদিন হল এক মাদক মামলায় জামিন পেয়ে জেল থেকে বেড় হল সে। বাবা-মা তার সাথে কথা বলে না। পরিবারে বাবা-মা ছাড়াও তার একমাত্র আদরের ছোট বোন নিতু। এই নিতুটাও এখন ওর সাথে ঠিক মত কথা বলে না। সবাই ওকে অনেক দূরে দূরে রাখে।

বাসায় নিজের ছোট রুমে একা একা বসে আছে সে। জীবনের এক চরম পর্যায়ে আজ সে উপনীত। টেবিলের ভিতর রাখা সিগারেটের প্যাক থেকে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে দেয় লম্বা এক টান। মনের ভেতর তার হাজারটা প্রশ্নের উদয় হতে থাকে!
সে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে-
আমি কি সত্যি অনেক খারাপ হয়ে গেছি?
সত্যিই তো! বাবা-মা, ছোট বোন এবং সমাজের চোখে এখন আমি চরম এক ঘৃণার পাত্র। তা না হলে সবাই কেন আমাকে এত দূরে দূরে রাখবে ?

ছন্নছাড়া এই জীবনের কথা চিন্তা করে কোন কূল কিনারা খুজে পায় না সে। হঠাৎ আজ তার কেন জানি শৈশবের কথা খুব বেশি মনে পরে গেল! সে ভাবতে থাকে সেই শৈশব এর জীবন গুলো কতই না মধুর ছিল। তার খুব কাছের বন্ধু ছিল সানি। সেই সানির সাথে কত মধুর সময় ই না সে পার করেছে। গাছে গাছে পাখির বাসা খোজা, একসাথে স্কুলে যাওয়া, নদীতে সাতার কাটা সহ মজার সব সময় বলতে গেলে সে সানির সাথেই পার করেছে। যদিও সানির সাথে ওর এখন আগের মত যোগাযোগতা নাই।

রুপমের মনে পরে, শৈশবের সময়টায় সবাই তাকে অকৃত্তিম ভাবে কতইনা ভালবাসত। আর এইতো কয়েক বছরের ব্যাবধানে তার গুছালো জীবন টা কি উলট পালটই না হয়ে গেল! লেখাপড়া তো দূরের কথা, কোন কাজেই তার এখন ঠিক মত মন বসে না।

সে ভাবতে থাকে….
“ঠিক সিগারেটের মতই যেন তার জীবনটা জ্বলে পুড়ে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে”

হঠাৎ টেবিলে রাখা মোবাইলটায় ক্রিং ক্রিং শব্দ বেজে উঠল…

মোবাইল টা হাতে নিয়ে দেখল তার বন্ধু রিয়াজ ফোন দিয়েছে। রিয়াজ তার প্রতিবেশি বন্ধু। ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে নিতেই অপর প্রান্ত থেকে রিয়াজ বলে উঠল…
রিয়াজঃ রুপম তুই কই?

রুপমঃ এইতো বাসায়।

রিয়াজঃ আরে বাসায় একলা একলা কি করিস? মাঠে আয়। আড্ডা দেই। সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে।

রুপমঃ নারে। শরীরটা আজকে বেশি ভাল নেই। তোরা আজকে চালায়া নে। আমার যেতে মন চাচ্ছে না।

রিয়াজঃ ঠিক আছে। কি আর করার? কাল কিন্তু দেখা করিস।

রুপমঃ আচ্ছা। ভাল থাকিস। Bye.

এই বলে ফোনটা রেখে দিল রুপম। অনেক ক্লান্ত দেখাচ্ছিল তাকে। যেন দুনিয়ার সব ক্লান্তি তার উপর এসে ভর করেছে। তার মনের যন্ত্রনাটা টা আজ এক্টু বেশি। যেই মাকে সে এত্ত বেশি ভালবাসে, সেই মা ও এখন তার সাথে ঠিক মত কথা বলে না। এইসব ভাবতে ভাবতে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় রুপম। আস্তে আস্তে তার চোখে নেমে আসে গভীর নিদ্রা।

গভীর রাত! সে খেয়াল করল কারা যেন কালো মুখোশ পরে তার চারদিক ঘেরাও করে রেখেছে। সে জানতে চাইল! তোমরা কারা? কি চাও?
কিছু বুজে উঠার আগেই ২ জন লোক তার মুখ চেপে ধরেছে। আরেকজন পকেট থেকে রিভালভার বেড় করে তার মাথার কাছে তাক করল। ভয়ে কাঁপছে রুপম। সে মারাত্তক ভাবে ভয় পেয়ে ঘেমে একাকার হয়ে গেল। আচমকা চিৎকার দিয়ে সে বসে পরল!

তার ঘুমটা ভেংগে গেছে। এতক্ষনে সে বুজতে পারল যে, সে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছে। সে মারাত্তক ভয় পেয়ে গেল।  মনে মনে ভাবতে লাগল, তাহলে কি আমার ভবিষ্যতে এইরকম কিছু ঘটতে যাচ্ছে? আর ঘটবেইবানা কেন? আমি নিজেও যেভাবে অন্যায়ভাবে আমার দলের লোকদের সাথে নিয়ে নিরপরাধ লোকদের অন্যায়ভাবে মেরেছি, খারাপ কাজ করেছি, এই রকম মৃত্যু আসাটা আমার জন্য তো অস্বাভাবিক কিছু না। এইসব ভেবে ভেবে সে বাকী রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দেয়। নিজেকে আজ সে খুব বড় অপরাধী মনে করছে। খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পরে তার সাজানো গুছানো জীবনটা আজ ধংসের দ্বার প্রান্তে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে সে খেয়াল করে বাড়ির উঠোনের এক কোনে তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, তার গর্ভধারিণী মা টা আনমনে মন খারাপ করে বসে আছে। মায়ের মলীন মুখটা দেখে সে বুঝতে পারল তার জন্যই আজ তার প্রিয় মায়ের মনটা ভাল নেই। এই দৃশ্য দেখে তার চোখের কোনে জল এসে যায়। সে ভাবে শুধু মাত্র তার জন্যই আজ তার মায়ের মনে এত কস্ট!

মন খারাপ করে বাড়ি থেকে বেড় হয়ে যায় রুপম। বাড়ির পাশেই তাদের পুরোনো সেই পুকুর ঘাটে গিয়ে বসে। মন খারাপ হলেই প্রায়ই সে ওই জায়গায় চলে আসে।
তার চোখের কোনে জল! অশ্রু ভেজা নয়নে সে ভাবতে থাকে…..
নাহ! জীবনটাকে এভাবে আর লাগামহীনভাবে চলতে দেওয়া যায় না। যেভাবেই হৌক ছন্নছাড়া এই জীবনটাকে এইবার বদলাতেই হবে। এমন সময় হঠাৎ তার শৈশবের বন্ধু সানির কথা মনে পড়ল। সানি কলেজে পড়া কালে তাকে অনেক চেস্টা করেছিল এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরাতে। কিন্তু তখন সে সানির কথায় কোন পাত্তাই দিত না।

সানি ছেলেটা ছিল খুব নম্র, ভদ্র আর মিশুক আর ধার্মিকও বটে। পরিবার আর সমাজের প্রায় সকলের কাছে প্রিয় ছিল সে। রুপম মোবাইলে সানির নাম্বার খুজতে থাকে এবং নাম্বার পেয়ে তাৎক্ষনিক ফোন দেয়।

রুপমঃ হেলো! সানি কেমন আছো?

সানিঃ আসসালামু আলাইকুম। আরে মিনহাজ! এতদিন পর মনে পরল আমায়? আলহামদুলিল্লাহ ভাল আছি।

রুপমঃ ওয়ালাইকুম আসসালাম। তুমি কোথায়? তোমার সাথে জরুরি কথা আছে।

সানিঃ ঠিক আছে ! বিকেলে দক্ষিন পাড়ার মাঠে আসো তাহলে।

রুপমঃ আচ্ছা! দেখা হচ্ছে বিকেলে। Bye.

দুপুরে আগে ভাগে খাওয়া দাওয়া সেরে সে চলে গেল দক্ষিন পাড়ার মাঠে। রুপমকে পেয়েই বুকে জড়িয়ে ধরল সানি। আনন্দে সানির চোখে অশ্রুতে ভিজে উঠলো।

সানিঃ সত্যি আজ তোমাকে পেয়ে আজ অনেক খুশি হয়েছি। আমি তো ভেবেছিলাম আমাকে ভুলেই গেলা কিনা?

রুপমঃ সত্যি বলিতে তোমাকে তো প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম। কিন্তু জীবনের এক চরম পর্যায়ে এসে আজ তোমার কাছে আসতে বাধ্য হলাম। আজ তোমার সাহায্য আমার অনেক বেশি প্রয়োজন।

সানিঃ কি হইছে তোমার বন্ধু? প্লিজ খুলে বলো।

রুপমঃ বন্ধু আজ আমি চরম হতাশার মাঝে নিমজ্জিত, আমার কর্মকান্ডে আজ আমি লজ্জিত আজ আমি অপরাধী। আমার ভুলটা আমি দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছি। আমার মা-বাবা, ছোটবোন কেউ আমার সাথে ঠিকমত কথা বলছেনা। এ সমাজ আমাকে ঘৃনা করে। দোস্তরে তুইনা আমাকে এ পথ থেকে ফিরাবার চেস্টা করেছিলি? তখন তো আমি তোমার কথার মর্ম বুজি নাই। তোমাকে পাত্তা দেই নাই। অন্ধকারের পথে চলতে চলতে আজ আমি আলোর মর্ম ভুলে গেছি। প্লিজ এই অন্ধটাকে একটু আলোর পথ দেখাও। ( কান্না ভেজা কন্ঠে এই কথাগুলো সানিকে বললো রুপম)।

সানিঃ আমার দোস্তটা আজ আলোর পথে ফিরে আসতে চায়। আমার কাছে এর চেয়ে সুখের বিষয় আর কি হতে পারে?

এদিকে অশ্রু সিক্ত নয়নে রুপমকে জড়িয়ে ধরে সানি বলতে লাগলঃ
আজ সত্যি আমি তোমাক এমন এক আলোর পথের সন্ধান দেব, যে পথ মুক্তির পথ, শান্তির পথ, যে পথে হাটলে জীবনে ্কোন অশান্তি থাকে না। যে পথের সর্বশেষ ঠিকানা হল চিরসুখের সেই জান্নাত। দেরি না করে সানি তার বন্ধু রুপমের হাত ধরে তার নিজ বাসায় নিয়ে গেল।

বাসায় রুপমকে কে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে রেখে ভিতর থেকে সানি কাপড় দিয়ে মোড়ানো বই আকৃতির কি যেন নিয়ে আসলো। এসে তার হাতে তুলে দিয়ে বললঃ এতা নাও বন্ধু! এটাই হচ্ছে সেই পরশ পাথর। এর পরশে তোর অন্ধকার জীবন আলোয় আলোয় ভরে উঠবে, দূর হয়ে যাবে সব দুঃখ গ্লানি। রুপমের হাত তখন কাঁপছে। সে ভয়ে ভয়ে কাপড়ে মোড়ানো বস্তুটা খুলতে লাগল। খুলে দেখল এতো আর কিছু নয়। এ হচ্ছে মানুষের জীবন বিধান মহা গ্রন্থ আল-কোরআন। রুপম মনে মনে চিন্তা করল! হায়রে এই মহা মূল্যবাণ বস্তু টা তো আমার ঘরেই ছিল। কিন্তু কি পোড়া কপাল আমার! কোন দিন এইটাকে একবার খুলে দেখার প্রয়োজনও মনে করি নাই! সানি রুপমকে বললঃ
মনে রাখবে আমাদের সৃষ্টি কর্তা হলেন মহান আল্লাহ। আর তিনিই আমাদের জন্য দিয়েছেন এই পথ পদর্শক, জীবন বিধান। আর এইটাও মনে রাখবা এই গ্রন্থের ভিতর যত বিধান আছে সবগুলোই আমাদের কল্যানের পাথেয়। এর বাহিরে যত পথ, মত আছে অই সবগুলোই অকল্যানের পাথেয়।
এই নাও বন্ধু এইবার পড়া শুরু করো।

রুপম তখন জোরে জোরে পড়া শুরু করল….
(আলিফ লাম মীম। এটি আল্লাহর কিতাব, এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। এটি হিদায়াত সেই ‘মুত্তাকী’দের জন্য, যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, নামায কায়েম করে এবং যে রিযিক আমি তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে খরচ করে)

রুপম যখন জোরে জোরে পরছিল তখন দুই জনেরই চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইতে লাগল। ঠিক তখনই মনের অজান্তেই যেন রুপমের কন্ঠে বেজে উঠল…

“আমি অন্ধকার এক পথে ফিরছিলাম,
আমি অজ্ঞে ছিলাম, আমি ধংসে ছিলাম….
গতি হারা জীবনে হারিয়েছিলাম..
সত্য পথের সন্ধান পেলাম
আমি চিনলাম, জানলাম সত্যকে মানলাম
ধংসের পথ হতে ফিরে এলাম”

(সম্পূর্ণ কাল্পনিক)
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, গাজীপুর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *