শৈশবের একাল-সেকাল !

শৈশবের একাল-সেকাল !

সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তীত হচ্ছে মানব সমাজ, তাদের চিন্তা ধারা এবং কৃষ্টি কালচার। প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা ধীরে ধীরে প্রবেশ করছি তথাকথিত এক আধুনিক জীবনধারায়। এর ফলে একদিকে যেমন আমাদের জীবনধারা সহজ হয়েছে অন্যদিকে আমাদের মধ্য থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী অনেক কৃষ্টি কালচার। শুধু তাই নয়, দিন দিন আমরা প্রকৃতির সংস্পর্শ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি এবং ফলশ্রুতিতে দিন দিন আমাদের রুচি ও চিন্তাধারায় আসছে ব্যাপক পরিবর্তন।

শৈশবের সেকালঃ আজ থেকে ১৫ বছর আগের কথা, তখনকার দিনে ফেসবুক কি জিনিস জানতামই না।তখন স্কুলে যাওয়া ও একাডেমীক পরাশুনার বাহিরে যেই সময় পেতাম অই সময়টা কাটাতাম নানান ধরনের মজার খেলার মাধ্যমে।তখন টেলিভিশনের তেমন প্রচলন ছিল না।মাঝে মাঝে কিছু বাড়িতে সাদাকালো টেলিভিশন দেখা যেত।আর চ্যানেল ছিল এক বিটিভি।টেলিভিশনে বিনোদন বলতে ২ টা প্রোগ্রাম উপভোগ করতাম।এক হল আলিফ লায়লা যা এক সপ্তাহ পর পর হত।আর বিটিভির হানিফ সংকেত এর ইত্যাদি।তখন টেলিভিশনে এখনকার মত অশালীন প্রোগ্রাম হত না।বিন দেশী সংস্কৃতিরর আগ্রাসন ছিল না বল্লেই চলে।আর আমরা এলাকার ছেলেপেলের দল দারুন সব খেলাধুলায় সময় কাটাতাম।তার মধ্যে ছিল- ডাংগুলি, চোর পুলিশ, গোল্লা ছুট, বোম বাস্টিং, সাত চারা, ক্রিকেট, দারিয়া বান্দা, ঘুড়ি উড়ানো সহ নানান ধরনের মজার সব খেলা ।খুব উপভোগ্য ছিল সেই দিনগুলি।তখন ছিল না মোবাইলের এত সহজ লভ্যতা।ছিল না ইন্টারনেট ব্যাবস্থা।এলাকায় মোবাইলের দুই একজন ব্যাবসায়ী পাওয়া যেত।তখন মোবাইল টিপাটিপি তো দুরের কথা কোন ভাবে মোবাইল একটু হাতে নিতে পারলে অন্য রকম অনুভুতি হত।আস্তে আস্তে গ্রামের কেউ বিদেশ থেকে আসলে ক্যামেরা মোবাইল নিয়ে আসত।মোবাইল দিয়ে ছবি তোলা যায় শুনলেই আশ্চার্য লাগত।তখনকার দিনে গ্রামে ছিল না বিদ্যুত ব্যবস্থা।হারিকেন এর আলোয় পরাশুনা করা লাগত বাতাস খাওয়ার এক মাত্র উপকরণ ছিল হাতপাখা।তখন ছেলেপেলার এখনকার মত নেশা করার সাহস পেত না।গ্রামের ছেলে মেয়েরা গার্ডিয়ান দের খুব মান্য করত এবং ভয়ও করত।অর্থ্যাৎ তখনকার দিনে ছেলে মেয়েদের সময় কাটাত স্কুলের পরাশুনা + নানান প্রকার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলায় মত্ত থেকে।সত্যি অসাধারন ছিল সেকালের শৈশব কালের সোনালী দিন গুলো।

শৈশবের একালঃ প্রযুক্তির কল্যানে বর্তমান কালের ছেলে মেয়েদের জীবন হতে পারে অনেকটা উন্নত হয়েছে।কিন্তু বর্তমান কালের ছেলে মেয়েদের শৈশব কাটে অনেকটা একঘেয়েমিতে।তাদের দেখিনা আগের কালের ছেলে মেয়েদের মত অবসরে ঘুড়ি উড়াতে, হাতে উঠতে দেখি না লাটিম।এখন চোখে পরে না আগের মত বিকেল বেলা ছোট ছেলেমেয়ারা পাড়ার মাঠে নানান মজার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলায় মত্ত থাকতে।তাদের দেখা যায় না খেলার মাঠে, দেখা যায় না দলবল নিয়ে পুকুরে সাতার কাটতে কিংবা দেখা যায় না বৃষ্টির মাঝে কাদায় গরাগরি করে বল নিয়ে মেতে থাকতে।কে হবে ক্লাসে প্রথম এ প্রতিযোগিতায় বই এর স্তুপে পড়ে থাকে তাদের নিরানন্দ জীবনের বেড়ে উঠা৷ অথবা কেউ কেউ পরে থাকে মোবাইল নামক এক ডিভাইস হাতে নিয়ে।এক ঘেয়েমি দুর করতে বর্তমানে অনেক কিশোরেরা মোবাইল, ইন্টারনেট আর ফেসবুকে নিজের মত তৈরি করে নিয়েছে এক ভার্চুয়াল জগৎ।অসুখের ভয়ে বৃষ্টিতে ভেজা হয়না।বইয়ের বোঝা, টেলিভিশনে কার্টুন দেখা কিংবা মোবাইলের স্ক্রীনে লুকিয়ে থাকে তাদের শৈশব।শৈশবের প্রকৃত আনন্দ তারা উপলব্ধি করেনা।বর্তমানে আকাশ সংসস্কৃতির যুগে অনেক ছেলে মেয়ে কে দেখা যায় টিভি স্ক্রীনের সামনে ভীন দেশী সংস্কৃতি নিয়ে পরে থাকতে।বর্তমানে এমনও দেখা যায় প্রায় সারা দিন রাত ইন্টারনেট আর ফেইসবুক নামক সোশাল নেটওয়ার্ক নিয়ে পরে থাকতে।এইগুলো নিয়ে শুধু যে পরে থাকে তাই নয়, বেশির ভাগ ছেলে মেয়ে অল্প বয়সেই সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে ইন্টারনেট কিংবা ফেসবুক এর অকল্যানকর ব্যাবহার করছে।প্রযুক্তির কল্যানে যোগাযোগ ব্যাবস্থা সহজ হওয়ায় সমাজে বৃদ্ধি পাচ্ছে মোবাইল প্রেম, অনলাইনে অবাধ ভার্চুয়াল যোগাযোগ অবশেষে প্রেম, ব্যাভিচার, নস্টামি।আমার এলাকার ক্লাস সিক্স এ পড়ূয়া এক ছোট ভাই কে দেখেছি ইন্টারনেট ফেসবুক এর কল্যানে কিভাবে চোখের সামনে অল্প বয়সে নস্ট হতে! সত্যিকারঅর্থে প্রযুক্তির কল্যানে আমরা পেয়েছি অনেক কিছু কিন্তু এর সঠিক ব্যাবহার না করার ফলে আমরা অনেক মুল্যবান কিছু দিন দিন হারিয়ে ফেলছি।নৈতিকতার অবক্ষয় এখন চরম পর্যায়ে।এই কিশোর বয়সে অনেকেই অধিক মাত্রায় সোসাল নেটওয়ার্ক নিয়ে পরে থাকায় তাদের মেজাজ হয়ে যাচ্ছে চড়া, লেখাপড়া কম করায় পরীক্ষার রেজাল্ট হচ্ছে খারাপ।এই হচ্ছে আধুনিক যুগে ছেলে মেয়েদের শৈশব কালের অবস্থা।নিজের চোখের সামনে যা দেখেছি তাই অগোছালো ভাবে তুলে ধরার চেস্টা করেছি।সব কিছু মিলিয়ে আমার কেন জানি মনে হয় একালের শৈশব থেকে সেকালের ব্যাকডেটেড শৈশবকাল টাই মনে হয় শত গুনে ভাল ছিল, মধুর ছিল, অনেক সহজ সরল ছিল….

[ ৯ নভেম্বর ২০১৪, গাজীপুর ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *