সেন্টমার্টিন দ্বীপ ভ্রমণের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা

সেন্টমার্টিন দ্বীপ ভ্রমণের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা

১৫ মে ২০১৫! গাজীপুর এডুকেশন সোসাইটির বার্ষিক সফর! যাত্রার স্থান ছিল কক্সবাজার। রাত আনুমানিক ১০ টার দিকে গাজীপুর থেকে রিজার্ভ বাসে রওনা দিলাম। পরদিন ১৬ ই মে সকালে কক্সবাজার পৌছে নাস্তা করলাম। সারাদিন গাজীপুর এডুকেশন সোসাইটির সদস্যদের সাথে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ঝাপাঝাপি, ইনানী ও হিমছড়ি ভ্রমনের মাধ্যমে পার করলাম। এটা ছিল আমার জীবনে ২য় বারের মত কক্সবাজার ভ্রমণ। এর আগে স্কুল থেকে ২০০৪ সালের দিকে গিয়েছিলাম। সারাটাদিন আনন্দে কেটে গেল। দেখতে দেখতে রাত হয়ে গেল। বলে রাখা ভাল, গাজীপুর থাকতেই আমরা ৪ জন (আমি, মোয়াজ্জেম আকন্দ, তাজুল ইসলাম ও লাবিব) আগে থেকেই প্লান করে রেখেছিলাম কক্সবাজার ভ্রমনের পর আমরা আলাদা হয়ে যাব। উদ্দেশ্য সেন্টমার্টিন ভ্রমণ। তো পরিকল্পনা মত রাতে সবার থেকে বিদায় নিলাম।

এখন শুধুই আমরা ৪ জন। মনে অনেক আনন্দ! প্রথমবারের মত বিশ্বের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে যাব। যেহেতু রাত ছিল, আমাদের কক্সবাজার থাকতে হবে। আগে থেকেই চট্রগ্রামের বন্ধু রিয়াদ কে একটা হোটেল ম্যানেজ করে দিতে বলেছিলাম। রিয়াদের এক বন্ধুর হোটেল ছিল কলাতলী মোরের পাশেই। দিগন্ত রিসোর্ট। তো ওকে ফোন দিয়ে সেখানে রাতে উঠলাম। বিশাল বড় একটা রুম! ৩ টা ডাবল বেড। রিলাক্সেই রাতটা সেখানে কাটালাম। তখন সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের জন্য অফ সীজন ছিল। তাই একটা সমস্যায় পড়ে গেলাম আমরা। তো হোটেলের মালিক আংকেল আমাদের বললেন তোমাদের চিন্তা করতে হবে না। আমি খোজ নিয়ে সকালে তোমাদের টিকেটের ব্যবস্থা করে দিবো। তো ওনার কথায় চিন্তামুক্ত হয়ে রাতে সী-বীচে একটু সময় কাটিয়ে, ডিনার করেই ঘুমিয়ে গেলাম।

১৭ ই মে ২০১৫!
খুব সকালে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করে নিলাম। নামাজ পরে আরো ঘন্টা খানেক ঘুমিয়ে নিলাম। ৮ টার দিকে আংকেল জানালেন যে আজকে কোন শীপ ছাড়বে না। শুনে মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। কি আর করা! আমরা ৪ জন প্লান করলাম টেকনাফ চলে যাই, গিয়ে সরাসরি দেখি কোন ব্যবস্থা আছে কিনা! নাস্তা করে সকাল ৯ টার দিকে টেকনাফের বাসে উঠে গেলাম। জীবনের প্রথম টেকনাফ যাচ্ছি, লক্ষ্য সেন্টমার্টিন দ্বীপ। বাসের জানাল দিয়ে যাই দেখি তাই ভাল লাগে। মোবাইল দিয়ে ইচ্ছামত ছবি তুললাম, ভিডিউ করলাম। আর সাথে ভ্লগার বন্ধু লাবিবের বক বক তো ছিলই।

আমরা টেকনাফের কোথায় নামবো তা জানা ছিল না। আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে যখন টেকনাফর কাছাকাছি চলে গেলাম তখন বাসের হেল্পার আমাদের টেকনাফের আগে একটা ভুল জায়গায় নামিয়ে দিল। কাছেই ছিল সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট। ওনাদের জিজ্ঞেস করতেই বললেন, “এই রোদের হেল্পার গুলো এমনি”। ওনারা তখন একটা সি এন জি থামিয়ে আমাদের টেকনাফ বাস স্ট্যান্ড নামিয়ে দিতে বললেন। অপরুপ সৌন্দর্যের নাফ নদীর পাশ দিয়ে চলে গেলাম টেকনাফ। সেখানে গিয়ে কনফার্ম হলাম যে আজকে শীপ যাবে না।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানলাম যে নিয়মিত ট্রলার আসা যাওয়া করে সেন্টমার্টিন।।কাছেই ট্রলার ঘাটে চলে গেলাম। কিন্তু ততক্ষনে আমরা বেশি দেরি করে ফেলেছি! আজকে আর ট্রলার যাবে না। সকাল ১০/১১ টার দিকে শেষ ট্রলার ছেড়ে গিয়েছে। বিকল্প একটা অপশন আছে! সেটা হল স্পীড বোটে। কিন্তু যখন ভাড়া জানতে পারলাম তখন বুজলাম এটা আমাদের জন্য না। ৪ জনে ৯০০০ টাকা ভাড়া! যা দিয়ে কিনা টুরের মোট বাজেটের কাছাকাছি।

হতাশ হয়ে টেকনাফ বাজারে ফিরলাম। আর বুঝি যাওয়া হলোনা স্বপ্নের সেন্টমার্টিন। সবাই মিলে সিদ্বান্ত নিলাম টেকনাফ যেহেতু এসেছি রাতটা এখানে থেকে আগামীকাল শেষ চেস্টা করবো। তারপর যা হয় হবে। আর আজকে বিকেলটায় টেকনাফটাও ঘুরে দেখা যাবে। খুজতে খুজতে আমাদের বাজেটের একটা হোটেল উঠে গেলাম। হোটেল দ্বীপ প্লাজা। মোটামুটি স্ট্যান্ডার্ড মানের। এমনিতেই আমাদের ৪ জনের ছিল সীমিত বাজেট। হোটেলে উঠে দুপুরের লাঞ্চ সেরে বেশ কিছুক্ষন বিশ্রাম নিলাম। বিকেলে বেড় হলাম। উদ্দেশ্য টেকনাফ ঘুরে দেখা। স্থানীয়রা মনের মধ্যে একটা ভয় ডুকিয়ে দিল। যেখানেই যাই না কেন অবশ্যই যেন সন্ধার মধ্যে ফিরে আসি। সন্ধার পর পাচারকারীদের উৎপাত আছে এলাকায়। আমরা একটা অটোরিকশায় করে সোজা চলে গেলাম টেকনাফ সী বীচে। বীচ টা কক্সবাজার থেকে একটু ভিন্নরকম। তীরে সাড়ি সাড়ি নৌকা লম্বা সিরিয়াল করে সাজানো। দেখতে অনেক সুন্দর লাগছিল। সী বীচে কিছুক্ষন হাটাহাটি করে, ছবি তুলে, ভিডিও করে, ভ্লগিং করে সময় পার করলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে আমরা হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

এদিকে সফর সংগী তাজুল ভাই অসুস্থ হয়ে গেল। ফার্মেসী থেকে কিছু প্রাথমিক ঔষধ সেবন করে আলহামদুলিল্লাহ দ্রুতই সেরে উঠলো। রাতের বেলা বাজারে একটু ঘুরাঘুরি করে রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরলাম। এদিকে সেদিন আকাশের অবস্থাটাও বেশি ভাল ছিল না। অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়তেছিল। রাতে আড্ডা দিয়ে সবাই ঘুমিয়ে গেলাম।

১৮ ই মে ২০১৭!
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি এখনো বৃষ্টি পরতেই আছে। আমাদের সেন্টমার্টিন যাত্রা আবারো অনিশ্চয়তার মধ্যে পরে গেল।

বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। থামবার কোন অবকাশ নেই। এবার সবাই সেন্ট মার্টিন যাবার আশা ছেড়েই দিলাম। কিন্তু এই পাগল মন মানছিল না। হোটেলের ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলাম ট্রলারে যাওয়া কেমন হবে? ওনি সহ যাকেই জিজ্ঞেস করলাম বলল ট্রলারে যাওয়া ঠিক হবে না অন্তত এই আবহাওয়ায়।

সব মিলিয়ে আমাদের মোটামুটি ৯০% মনে হয়েছিল যে আমাদের আর সেন্ট মার্টিন যাওয়া হচ্ছে না।

এদিকে বৃষ্টি থামলো সকাল ৯ টার দিকে। আমরা ৪ জন আলাপ করে সিদ্বান্ত নিলাম ঘাটে গিয়ে ট্রলারের খোজ নিবে। ঘাটে চলে গেলাম। অনেকগুলো বড় বড় নৌকা ঘাটে বাঁধা। তখনো হাল্কা বৃষ্টি পড়তেছিল। ঘাটে গিয়ে পেয়ে গেলাম ট্রলারের টিকেট বিক্রেতা স্থানীয় আব্দুল্লাহ কে। ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম, ট্রলার যাবে কিনা আজ! ওনি মাঝিকে জিজ্ঞেস করে সমুদ্রের অবস্থা জানলেন। যদিও বৃষ্টি হইছে তাও বাতাসের তেমন তীব্রতা ছিল না। ওনি জানালেন ট্রলার ছাড়বে। ওনার কথায় যেন প্রাণ ফিরে পেলাম।

এদিকে ফোনে সিনিয়র ভাইরা এবং যারা আগে গিয়েছেন সবাই আগে থেকেই ট্রলারে যাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন একটু ভেবে দেখতে। যদিও তাদের এই নিষেধাজ্ঞাই হয়তো ট্রলারের প্রতি আমারদের আকর্ষনটা বাড়িয়ে দিয়েছিল!

কাউন্টারের আব্দুল্লাহ ভাই থেকে ৪ টা টিকেট কেটে নিলাম। এর পর ওনি পাশেই ওনার অফিসে আমাদের নিয়ে বিশ্রাম করতে দিয়েছিলেন ও সামান্য আপ্যায়নওও করেছিলেন। সেন্ট মার্টিন ও ট্রলার সম্পর্কে আমাদের মনের লুকায়িত অনেক প্রশ্ন করে অনেক কিছু জেনে নিয়েছিলাম সেদিন।

একটা কথা সত্য, ভাগ্য অনেক ভাল ছিল আমাদের। ট্রলারে যদি সেন্টমার্টিন না যেতাম, তবে জীবনের আনন্দময় একটা জিনিস মিস করতাম। আমাদের ৪ জনের মধ্যে ১ জন (মোয়াজ্জেম ভাই) সামান্য ভয় পেয়েছিলেন, তাও কয়েক মুহূর্ত পরে সবাই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। অন্যরা সবাই স্বাভাবিকই ছিলাম।

নির্ধারিত সময়ে আনুমানিক ১১ টার দিকে ট্রলার ছাড়লো। শুরু হল আমাদের স্বপ্নের সেন্টমার্টিন যাত্রা। সবার ভেতরে ভেতরে অন্যরকম একটা এডভেঞ্চার কাজ করছিল। নাফ নদী দিয়ে সামান্য যাওয়ার পর বিজিবি চেক পোস্টে ট্রলার থামালো। যদিও সন্দেহ না হওয়ায় আমাদের কিছুই চেক করেনি।

আবারো ক্ষনিক বাদে ট্রলার সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে চলতে শুরু করলো। আমরাও মোবাইল ক্যামেরা অন করে একশ্যান শুরু করে দেই। ঘন্টা খানেক চলার পর যখন মাজ সমুদ্রে আসলো ট্রলার । তখনি শুরু হলো বিশাল বিশাল ঢেউ। কেন জানি ভয়ের পরিবর্তে আমার ভেতরকার অন্যরকম একটা এডভেঞ্চার কাজ করছিল। বাকীদের কি অবস্থা ছিল আল্লাহ মালুম!

চলতে চলতে প্রায় আড়াই ঘন্টা পর সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌছে গেলাম। দ্বীপের ঝেটিতে ট্রলার ভিরলো। লাবিব আগে থেকেই এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে সীমানা রিসোর্ট টা বুকিং দিয়ে রাখছিল। রিসোর্টের মালিক আমিন ভাইকে ওনাকে ফোন দিলাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই ওনি আমাদের রিসিভ করতে ঝেটিতে চলে আসলেন। আমাদের রিসোর্ট টা ছিল সেন্টমার্টিন বাজার থেকে একটু দূরে। দ্বীপের একদম পশ্চিমে। হুমায়ুন আহমেদের সমুদ্র বিলাশের কাছেই। আমরা ৪ জন ও আমিন ভাই (রিসোর্টের মালিক) একটা ভ্যানে করে রিসোর্টে পৌছে গেলাম।

সীমানা পেরিয়ে! অসাধারন সুন্দর নিরিবিলি একটা রিসোর্ট। নামের সাথে একটা মিল অনুভব করলাম। মনে হচ্ছিল সত্যিই যেন আমরা সীমানা পেরিয়ে বহু দূরে চলে এসেছি। আমরা আসার সাথে সাথে আমিন ভাই গাছ থেকে পেরে তাজা ৪ টা মিষ্টি ডাব নিয়ে এসে ওনার রিসোর্টে আমাদের আপ্যায়ন করলেন।

সেন্ট মার্টিনের অফ সীজন চলছিল। এই সময়টায় সাধারণত তেমন কোন পর্যটক এখানে আসেন। পুরো দ্বীপ টাই ফাকা ফাকা লাগছিল। আমিন ভাই আমাদেরকে ওনার সীমান পেরিয়ে রিসোর্টের সব থেকে ভাল রুমটা আমাদের দিলেন। দুইটা ডাবল বেডের রুম, এটাচ বাথরুম সহ। সীজনের সময় যেটা ৩০০০ টাকা ভাড়া আমরা সেটা ১৫০০ টাকায় ঠিক করলাম।

আমিন ভাই আমাদের জন্য একটা পিচ্ছি গাইড ঠিক করে দিলেন। ওর নাম ছিল হেলাল। ভালই গান গায়। সরল সোজ একটা ছেলে। আমাদের রুমটা ছিল বীচের একদম সন্নিকটে। রুমে শুয়ে শুয়েই সমুদ্রের গর্জন উপভোগ করা যায়। সে এক অন্যরকম অনুভূতি। আমরা একটু ফ্রেস হয়ে সোজ বীচে চলে গেলাম।

আহ! সেন্টমার্টিন! প্রথম দর্শনেই মনটা ভরে গেল। আকাস ও সমুদ্রের পানি অনেক নীল দেখাচ্ছিল। চোখ সরাতে ইচ্ছে করছিল না। মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। আর মনে মনে ভাবছিলাম! ইস এখানে না আসলে কি মিসটাই না হয়ে যেতো!

তখনো দুপুরের খাওয়া হয়নি। আমাদের গাইড কে নিয়ে চলে গেলাম ঝেটির কাছে বাজারে। রুপচাঁদা দিয়ে দুপুরে খাওয়া দাওয়া করলাম। সুমুদ্রের তাজা রুপচাদা ফ্রাইয়ের টেস্ট টা ভুলার নয়। খাওয়া দাওয়া করে ঝেটিতে কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে সোজা রিসোর্টে চলে আসলাম। রিসোর্টে এসে বীচে কিছুক্ষন ঘুরাগুরি করে ছবি তুলে রুমে চলে আসলাম। সকাল বেলা বৃষ্টি হওয়ায় আবহাওয়া টা ঠান্ডা ঠান্ডা ছিল। প্রচন্ড বাতাছ ছিল। দুপুরে বাজার থেকে মুড়ি চানাচুর এনে রেখেছিলাম সন্ধায় তা দিয়ে টিফিন করলাম। একটু বিশ্রাম নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম সবাই। সন্ধার পর বেশ কিছুক্ষন ঝেটিতে কাটিয়ে দিলাম।

আহ! এই গরমের মধ্যে ঝেটিতে প্রচন্ড বাতাস শরির ঠাণ্ডা করে দিচ্ছিল। বেশ কিছুক্ষন শুয়ে থাকলাম। সমুদ্রের গর্জন আর তীব্র বাতাশ অনুভব করতেছিলাম মন ভরে। হঠাৎ নুরে আলম নামের একটা ছেলের সাথে দেখা হল! সে মূলত বিদেশি পর্যটকদের গাইড করতে করতে খুব ভাল ইংরেজি শিখে গেছে। তার কন্ঠে বেশ কিছু গান শুনলাম।

এদিকে আকাশের অবস্থা বেশি ভাল ছিল না। ছিল বৃষ্টির সম্ভাবনা।। আমরা বেশিক্ষন দেরি না করে রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে সোজা রিসোর্টে চলে আসলাম। রিসোর্টে আসার কিসুক্ষন পরই তুমুল বেগে বৃষ্টি শুরু হলো।

রাত তখন আনুমানিক ১১ টা হবে। সাধারণত অফ সীজনে সন্ধার পর থেকে ৯ টা পর্যন্ত জেনারেটর চালু করা হয়। সেন্ট মার্টিনের বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। জেনারেটর, সোলার আর পাওয়ার ব্যাংকই একমাত্র ভরসা। তো রিসোর্টের বারান্দায় বসে আছি আমরা ৪ জন আর সাথে রিসোর্টের মালিক আমিন ভাই। মাঝে মধ্যেই বৃষ্টির দমকা হাওয়া আমাদের ভিজিয়ে দিচ্ছিল।

একটু চিন্তা করুন তো! রাত ১১ টা! রুমের বাহিরে সমুদ্রের গর্জন। আবার সাথে তুমুল বৃষ্টি। দ্বীপের একদম পশ্চিমে একটা নিরিবিলি রিসোর্টে আমরা বসে আছি। সমগ্র দ্বীপে আর তেমন পর্যটক নেই বললেই চলে। আর এমন একটা পরিবেশে জমিয়ে আড্ডা! আহ! চোখ বন্ধ করে চিন্তা করলেই শান্তি লাগে! শুনেছিলাম বেশ কয়েক মাস পর সেদিন সেন্ট মার্টিনে বৃষ্টি হয়েছিল। না হয় গরমে অবস্থা একটু কঠিন হয়ে যেতো।

বেশ কিছুক্ষন আমিন ভাইয়ের সাথে আড্ডা দিলাম। রাত ১২ টার উপরে বেজে গেছে ইতিমধ্যে। ঘুমানো দরকার। আমিন ভাই বিদায় নিয়ে ঘুমোতে গেলেন। মন চাচ্ছিল সারারাত এখানেই বসে কাটিয়ে দেই। আবার চোখে ঘুমও পাচ্ছিল। আগামিকালের চিন্তা করে ঘুমিয়ে গেলাম সবাই।

১৯ মে ২০১৫, সমুদ্রের গর্জন শুনে সকালের ঘুম টা ভাংলো সেন্ট মার্টিনের সীমানা পেরিয়ে রিসোর্টে। ফজরের নামাজ পরে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। সকাল থেকেই সারপ্রাইজ শুরু। আমরা যারা শহরে থাকি, তারা হয়তো এমন একটা সকাল কল্পনাও করতে পারি না। রাতের এমন একটা ঝম্পেশ আড্ডার পর সকালে সমুদ্রের গর্জনে ঘুম ভাঙা আর সাথে সাথেই সমুদ্রের থেকে ছুটে আশা ঠান্ডা বাতাস, সে এক অভূত অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা ও ভাল লাগা। যা কিনা কোনদিন কারো পক্ষে মুখে বলে বা ডিজিটাল ছবি/ভিডিও দেখিয়ে বোঝানো সম্ভব না। একমাত্র সেখানে থাকলেই উপলব্ধি করা যেতে পারে।

সকালে সোজা বীচে চলে গেলাম। জোয়ারের কারনে সমুদ্রের পানি একদম কিনারায় চলে এসেছে। সকালে আশে পাশে একটু ঘুরে সিদ্বান্ত নিলাম পুরো সেন্ট মার্টিনের চারপাশটা পায়ে হেটে ঘুড়বো। সবাই বেড়িয়ে পড়লাম। আমিন ভাই সহ স্থানীয়রা জাল দিয়ে সমুদ্র থেকে মাছ ধরতেছিলেন। আমরা দ্বীপের উত্তরের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। চার পাশে সে কি সৌন্দর্য!

ঘন্টা দুইয়েক হাটতে হাটতে চলে গেলা জেটির পাশের বাজারে। সেখানে গিয়ে নাস্তা করে আবার দ্বীপের মাঝখান দিয়ে হেটে রিসোর্টে ফিরলাম। রুমে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে সোজা বীচে চলে গেলাম। উদ্দেশ্য গোসল করবো। আমাদের গাইড হেলালকে ছবি উঠানোর দায়ীত্ব দিয়ে সবাই লুংগি পরে সমুদ্রে নেমে গেলাম। সমুদ্রে প্রবাল থাকায় একটু সাবধানে গোসল করতে হয়েছিল। ঘন্টা খানেক ঝাপাঝাপি পরে রুমে এসে ফ্রেস পানি দিয়ে গোসল করে নিলাম। কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে নিলাম সবাই।

আজ সেন্ট মার্টিনে কড়া রোদ উঠেছে। আমাদের গাইড হেলাল বলল, দূরে একটা জায়গা আছে যাবেন? সেন্ট মার্টিনের সব থেকে সুন্দর জায়গা। এটা শুনার পর আর লোভ সামলাইতে পারলাম না। প্রথমে প্ল্যান ছিল নৌকা ভাড়া করে যাব। পরে প্ল্যান চেঞ্জ করে সমুদ্র সৈকত ধরে হেটে হেটে যাওয়ার প্ল্যান হলো। এতে যাওয়া আসা মিলিয়ে একটি সম্পূর্ণ চক্কর হয়ে যায় পুরো দ্বীপের চারপাশে। আমাদের গাইড হেলাল বলেছিল পায়ে হেটে গেলে ২ ঘন্টা লাগবে। তার ২ ঘন্টা যে এতটা লম্বা আমাদের আইডিয়া ছিল না। হেলালের কন্ঠে “মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা” চট্রগ্রামের এই আঞ্চলিক গান শুনতে শুনতে ও আশে পাশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে একসময় পৌছে গেলাম ছেড়া দ্বীপ। ক্লান্তিতে চোখ বুজে এসেছিল। তবে আনন্দ ছিল প্রচুর। ভাল লেগেছিল অনেক অনেক বেশি।

ছেড়া দ্বীপ গিয়ে জানতে পারলাম সেখানে একটি মাত্র পরিবার থাকে। ওদের ওখানে আবার খাবার ব্যবস্থা আছে। মুরগি কিংবা খাসি চয়েজ করে দিলে ওরা জবাই করে রান্না করে দেয়। আমরা এতই বেশি ক্লান্ত ছিলাম যে সেন্টমার্টিন বাজারে পৌছে খাওয়া সম্ভব ছিল না। আমরা একটা দেশি মুরগি অর্ডার দিয়ে ঘুরতে গেলাম।

ছেড়া দ্বীপের মূলত ৩ টা অংশ। স্থানীয়রা ৩ টা অংশকে ভিন্ন নামে ডাকে।। ১ম অংশকে ছেড়াদ্বীপ, মাঝের অংশকে নিঝুম দ্বীপ ও শেষ টাকে দারুচিনি দ্বীপ বলে। ছেড়া দ্বীপ কে আবার স্থানীয় ভাষায় ছেড়া দিয়া বলে ওরা।

আমরা একে একে ছেড়া দ্বীপ ঘুরলাম তারপর মাঝখানের অংশ নিঝুম দ্বীপে গিয়ে ছোট একটা বেড়ার মসজিদ পেলাম। সেখানে দুই রাকাত শুকরিয়া নামাজ আদায় করে নিলাম।
তার পর চলে গেলাম বাংলাদেশের সর্বশেষ স্থল সীমা দারুচিনি দ্বীপে। অসম্ভব সুন্দর একটা জায়গা। সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল পানি ও ছোট বড় ধারালো অনেক পাথর ভিন্নতর একটা সৌন্দর্য্য দান করছে দারুচিনি দ্বীপকে।

এদিকে প্রচন্ড ক্লান্ত শরীর ও ক্ষিধা নিয়ে যেখানে খাবার অর্ডার করেছিলাম সেখানে পৌছলাম। এসে দেখি খাবার রেডি। আলু ভর্তা, মুরগি ও ডাল দিয়ে খেয়ে নিলাম।

খেয়ে দেয়ে আবার সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পথিমধ্যে সমুদ্র তীরে সালাতুল মাগরিব আদায় করে নিলাম। সন্ধার ঘন্টাখানেক পর বাজারে পৌছে গেলাম। সেখানে গিয়ে ঝেটিতে কিসুক্ষন থাকলাম। খুব বেশি গরম পড়েছিল সেইদিন। ঝেটিতে বাতাসও ছিল না। তাই বেশি দেরি না করে রাতের খাবার খেয়ে সোজা রুমে চলে গেলাম। ক্লান্ত শরীর নিয়ে আগে আগেই সবাই ঘুমিয়ে গেলাম।

২০ মে ২০১৫! সকালে উঠলাম! আশ পাশটায় একটু সময় কাটিয়ে রুমে এসে বিশ্রাম নিলাম। কেউবা আবার দোলনায় দোল খাচ্ছিল। সকাল ১০ টায় ট্রলার। তাই সবাই রেডি হয়ে গেলাম। বিদায় বেলা আমিন ভাই আমাদের আবারো নিজের গাছের ডাব দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। আমাদের গাইড হেলাল্কে কিছু বকশিষ দিয়ে সবাই একসাথে স্মৃতি হিসেবে একটা গ্রুপ ছবি নিয়ে বিদায় জানালাম। বাজারে এসে সবাই নাস্তা করে ডাব খেয়ে ট্রলারের অপেক্ষা করলাম। নির্ধারিত সময় ট্রলার আসলো। হেলাল কে বিদায় জানিয়ে ট্রলারে চড়ে টেকনাফ চলে আসলাম। সেখান থেকে কক্সবাজার এসে বাকী সময়টা বীচে কাটিয়ে রাতের বাসে গাজীপুর চলে আসলাম। এভাবেই শেষ হয়েছিল আমার জীবনের সেরা একটি ভ্রমনে। এখন পর্যন্ত এই টুরটা আমার ভ্রমন তালিকায় নাম্বার ওয়ান হিসেবেই জায়গা দখল করে আছে। এই কয়দিন রোদে পুরে চেহারার যা অবস্থা হয়েছিল। বাড়িতে আসার পর সবাইকে একটা কথাই শুনতে হয়েছিল। তোদের এই অবস্থা কে? চেনাই তো যায় না….

প্রয়োজনীয় নোটঃ (জেনে রাখা ভাল)
১। সেন্ট মার্টিন এ যেতে হলে আপনাকে অবশ্যই টেকনাফ যেতে হবে।
২।অনেক টাকা থাকলে হেলিকপ্টারে যেতে পারবেন, খরচ হবে আনুমানিক ৩০/৪০ হাজার টাকার মত।
৩।ট্রলারে যাতায়াত খরচ যেতে ২১০ টাকা এবং ফিরে আসতে ১৫০ টাকা অন্যদিকে জাহাজে প্রায় ৫০০ টাকা।
৪। অফ সীজনে গেলে সকল খরচ কম পড়বে।
৫। সর্বোপরি সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করতে গেলে অবশ্যই ছেড়া দ্বীপ যাবেন এবং অবশ্যই চেস্টা করবেন বোটে না গিয়ে সমুদ্র সৈকত ধরে হেটে যাওয়ার। না হয় সেন্টমার্টিন ভ্রমনের আসল এডভেঞ্চার টাই মিস হয়ে যাবে।
৬। ভ্রমনে একটু এডভেঞ্চার নিয়ে আসতে চাইলে জাহাজে না গিয়ে ট্রলারে যেতে পারেন।
৭। ট্রলারে মানুষ যতটা ভয় দেখায়, আসলে অত ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নাই।
৮। নিরিবিলি পরিবেশ পছন্দ হলে অফ সীজনে যাবেন। (মার্চ – অক্টোবর)।

স্মৃতির ডায়েরি থেকে…
[ ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭, গাজীপুর ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *