হারিয়ে যাওয়া শৈশব!

নব্বই দশক কিংবা তার কাছাকাছি সময়ে যাদের জন্ম তারা এই কারনে ভাগ্যবান যে, তাদের আমার মত দুই প্রজন্ম দেখার সুযোগ হয়েছে। হয়ত আমাদের জেনারেশনটায় তেমন বিশেষ কিছু ছিল না। কিন্তু সেই দিনগুলো সত্যি অনেক উপভোগ্য ছিল। আমাদের পরে সেই প্রজন্মকে হয়ত আর খুজে পাওয়া যাবে না। আসুননা দেখি কেমন ছিল আমার/আমাদের ছেলেবেলাঃ

যখন কোন ফলের দানা খেয়ে ফেলতাম তখন সবাই বলাবলি করতো “তোর পেটের মধ্যে গাছ হবে এবার”। ব্যাপারগুলো যে অবিশ্বাস করতাম এমনটাও কিন্তু ছিল না। দুশ্চিন্তা হইত 🙈

হাতগুলো জামার মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়ে বলতাম, দেখো- আমার হাত নেই। 😃

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে নিয়মিত দলবেঁধে মক্তবে যাইতাম। মাথার টুপি হাতে নিয়ে তার মধ্যে মুড়ি + মিশ্রি নিয়ে খাইতে খাইতে যাইতাম 😃

রাতের বেলা যখন হাটতাম তখন ভাবতাম আমি যেখানে যাচ্ছি, চাঁদটাও আমার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। 😂

একটা কলম ছিল এমন, যেটা থেকে বিভিন্ন বোতাম চাপলে চার রকম কালি বেড় হত, আর তার চারটে বোতাম একসাথে টেপার চেষ্টা করতাম। 😞

বাড়িতে অবস্থানকালে যখন আইস্ক্রীমওয়ালা তার আইস্ক্রীম রাখার বক্স বাড়ি দিত তখন তা শুনে মনের মধ্যে অন্যরকম একটা ফূর্তি কাজ করতো। বাড়ি থেকে গোপনে চাউলের ডিব্বা দিয়ে চাউল নিয়ে আইসক্রীম খেতাম। 🙈 একই সিস্টেমে কটকটি ওয়ালা থেকে কটকটি/সম্প্রাপ্রি খাইতাম।🙊

বাড়ির দরজার পেছনে লুকিয়ে থাকতাম কেউ এলে চমকে দেবো বলে, সে আসতে দেরি করছে
বলে অধৈর্য হয়ে বেরিয়ে আসতাম। 😭

সুইচের দুদিকে আঙুল চেপে অন্-অফ এর মাঝামাঝি ব্যালেন্স করার চেষ্টা করতাম। 😃

ক্লাসে বসে কলম-কলম খেলতাম 👿

যেদিন বৃষ্টি হইতো সেদিন স্কুলে যাইতে মন চাইতো না। অর্ধেক রাস্তা গিয়ে ইচ্চা করে পিছল খেলে বাড়ি ফিরে আসতাম। এসে বলতাম যে, ” পিছলা খাইয়া পইড়া গেছি, কাপড় ময়লা হইয়া গেছে, তাই চলে আসছি” 😎

স্কুলে টিফিনের জন্য নিয়মিত ২ টাকা নিয়ে যাইতাম। ২ টাকায় বাটারবন পাওয়া যেত।।সেসময় খুব বিখ্যাত ছিল। আর যেদিন ৫ টাকা নিয়ে যাইতাম সেদিন তো বিশাল অবস্থা। অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সিংগারা পুড়ি খাইতাম। মাঝে মাঝে বন্ধুদের খাওয়াইতাম 😂

বাড়ি থেকে অদূরে সাপ্তাহিক বাজারে গিয়ে লটারি আইসক্রিম, গজা (মিস্টি) খাইতাম।🙊

সাড়া বছর মাটির ব্যাংকে পয়সা জমাইতাম। আর পহেলা বৈশাখের সময় মেলায় যাইতাম। মেলা থেকে খেলনা বন্ধুক (ফাইভ স্টার), কাঠ আর টিনের তৈরী গাড়ি, বড় ডাক ঘুড়ি) কিনতাম 😒

বাড়ি থেকে অদূরে একটা বাড়িতে বকুল ফুল কুড়াইতে যাইতাম 😫

বাড়িতে একটা ২১ ইন্সি সাদাকালো ন্যাশনাল টিভি ছিল। টিভিতে মিনা কার্টুন,গডজিলা দেখতাম। তখন শুধু বিটিভি ছিল। দুই ধরনের নাটক হইতঃ সাপ্তাহিক/প্যাকেজ নাটক। (আগ্রহ ছিল না তেমন)। তবে শুক্রবারে দুপুর ৩টা থেকে অপেক্ষা করতাম কখন বিটিভিতে বাংলা সিনেমা শুরু হবে এবং সন্ধার পরে আলিফ লায়লা, সিন্দাবাদ, রবিনহুড, হারকিউলিক্স ও এক্স-ফাইলস দেখতাম। পরিবর্তী পর্ব দেখার জন্য পুরো সপ্তাহ অপেক্ষা করতাম। 😫

ঘরের মধ্যে ছুটে যেতাম, তারপর কি দরকার ভুলে
যেতাম, ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর মনে
পড়ত। 😃

কাগজ, ভাত (আইকা), আর নাড়িকেলের ডগা থেকে তৈরি ঝাড়ুর কাঠি দিয়ে তেলেংগা ঘুড়ি বানাইতাম আর বিকালে ঘুড়ি উড়াইতাম। 😒

স্কুল ছুটির দিন গাছের বাকা ডাল আর বালটিউব দিয়ে তৈরি “গোলাই” দিয়ে পাখি শিকারে বের হইতাম। এক চাচাত ভাইয়ের হাত খুব সই ছিল। তার পিছে পিছে ঘুরতাম। 🔫

বিকেল বেলা নিয়মিত ওপেনটি বায়োস্কোপ, কুতকুত না খেললে বিকালটাই মাটি হয়ে যেত। এ বাড়ী ও বাড়ীর চাচাত ভাই বোনেরা সবাই মিলে বাড়ীর উঠানে চোর পুলিশ খেলা, সাত চারা, টেনিস বলে কস্টটেপ পেচাইয়া পিঠ ফুডান্তি (বোম্বাসটিং) খেলতাম 😱

রাতে কারেন্ট চলে যাবার পর কিংবা/যখন কারেন্টই ছিল না তখন সবাই উঠোনে পাটি বিছিয়ে বসে বসে বয়স্ক দাদা/চাচাদের কাছ থেকে ভূতের গল্প/পুরনোদিনের গল্প শুনতাম। আর পাশাপাশি জ্বলতে থাকা জোনাকী পোকা ধরতাম 😂

মাঝে মাঝে গ্রুপ স্ট্যাডির নাম করে এলাকার চাচাতো ভাইয়েরা একসাথে ঘুমাইতাম। আর সেট খেলতাম, পাশাপাশি WWE Wrestling খেলতাম 😃

রাতের বেলা আব্বু ও দাদীর মুখে নানা ধরনের গল্প শুনতাম। শুনার সময় কল্পনায় সেগূলো ভেসে উঠতো। আর মনে হত এইগুলো সত্যি সত্যি ঘটেছে 😃

আমাদের সময়ে শীতকাল্টা সত্যিই অনেক কালারফুল ছিল। ফাইনাল পরীক্ষা যেহেতু শেষ, সকালে
পড়া নাই। এত মজা কই রাখি? তখন নানি বাড়ি সহ আত্মীয় স্বজনের বাড়ি বেড়াইতে যাওয়া হইত। 😲 তবে ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ যত আগাইয়া আসত মনের মধ্যে ভয় তত বাড়ত। ওইদিন যে ফাইনালের রেজাল্ট দিবে। 😭

আজকাল ছেলে মেয়েদের শীতকাল, গরমকাল
নাই। রুটিন সেই একটাই। [বাসা- স্কুল/কলেজ/কোচিং – ফেসবুক -চ্যাট পর্যন্তই সীমাবদ্ধ]

এখন অধিকাংশ ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের ফ্রাস্টেশনে ভুগতে দেখা যায়। আর আমরা কলেজে উঠার আগ পর্যন্ত মন খারাপ, ফ্রাসটেশন কি জিনিস বুঝতামই না। মন খারাপ মানে হইল আলিফ লায়লার সময় টিভির ব্যাটারিতে চারর্জ না থাকা, টিভিতে যেদিন খেলা দেখাবে সেদিন ক্লাস/প্রাইভেট থাকা।

নব্বই দশকে ছেলেবেলার সে দিনগুলোতে আমরা
হয়ত খ্যাত ছিলাম।😂 এখনকারমত আধুনিক প্রযুক্তির ছোয়া ছিল। কিন্তু আমাদের সারাজীবন মনে রাখার মত অন্যরকম উপভোগ্য একটা শৈশব ছিল।

ছোটবেলা শুধু বড় হইতে মন চাইতো। ইশ আমি যদি এখন বড় থাকতাম! কি মজা হইত! কিন্তু এখন যদি কেউ জিজ্ঞেস করে তোমার ইচ্ছা কি? আমি অকপটে মনে হয় বলে ফেলবো-
“আবার ছোট হতে চাই”

[ ১৮ নভেম্বর ২০১৭, গাজীপুর ]

Leave a Comment