ভুটানের রাজধানী থিম্পু ভ্রমণ: সুখী মানুষের দেশে (২য় পর্ব)

ভুটানের রাজধানী থিম্পু ভ্রমণ: সুখী মানুষের দেশে (২য় পর্ব)

২২ ডিসেম্বর ২০১৯ ! দিনটি ছিল রবিবার, ভুটানের সরকারি ছুটির দিন। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো। রুমেই ফজরের নামাজ আদায় করে তিন জন মিলে খানিক গল্প গুজব করে সময় কাটালাম। হঠাৎ  দৃষ্টি চলে গেলো ছোট টি টেবিলে রাখা কফি, চিনি, কাপ ও পানি গরম করার ফ্লাক্সের দিকে।  এই মাইনাস ১ ডিগ্রি তাপমাত্রায় কফি পান করলে মন্দ হয়না। খুব সহজেই তৈরী করে ফেললাম গরম গরম কফি। ধোঁয়া উঠা কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে জানালা দিয়ে বাহিরের সৌন্দর্য দেখতেছিলাম। সে এক অন্যরকম অনুভূতি।

থিম্পু শহরের Hotel Kenny এর জানালার পাশে কফি হাতে একটি সকাল

আজকের সারাদিন থিম্পুর জন্য বরাদ্ধ। আমাদের ড্রাইভার পেমা সকাল ১০ টার দিকে হোটেলে আমাদের নিতে আসার কথা। তো ভাবলাম পেমা আসার আগে ভোরের থিম্পুটা হেঁটে হেঁটে দেখা যাক। এ সুযোগ মিস করা ঠিক হবে না। সবাই ভারী শীতের পোষাক পরে বের হয়ে গেলাম। সব কেমন শান্ত, নিস্তব্দ।

Hotel Kenny at Thimpu

পাশেই বয়ে যাওয়া একটা ট্রেইল থেকে পানি বয়ে যাওয়ার আওয়াজ আসছিলো। ভাবলাম থিম্পু নদীর তীরে এক্টু ঘুরে আসা যাক। দেশে থাকতেই ভুটানের গুগল ম্যাপ অফলাইন ডাউনলোড করে রেখেছিলাম। ম্যাপ অন করে নদীর দিকে হাঁটা শুরু করে দিলাম। অজানা এক নিস্তব্ধ শহরের অলিগলি কিছুই চিনিনা জানিনা। যতই সামনে এগুচ্ছিলাম আর অবাক হচ্ছিলাম শহরের সৌন্দর্য দেখে। একটা দেশের রাজধানী এতটা গুছানো, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতে পারে? আগে অভিজ্ঞতা ছিল না। সামনে এগুতে লাগলাম আর ফাঁকে ফাঁকে ক্যামেরায় মূহুর্তগুলো সংরক্ষণ করচ্ছিলাম ভবিষ্যতের জন্য।

থিম্পুর রাস্তায় কোন এক সকাল

এতক্ষনে রাস্তায় বেশ কিছু ট্যাক্সি চলতে দেখলাম। এখানে ট্যাক্সি ও কয়েকটা মিনিবাস ছাড়া অন্য কোন যানবাহন চোখে পড়লো না। হাটতে হাটতে অবশেষে থিম্পু নদীর তীরে চলে গেলাম। স্থানীয় ভাষায় তারা নদীকে “চো” বলে। থিম্পু চো মানে থিম্পু নদী। কিছুক্ষণ বসে বসে থিম্পু নদীর বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ পানির সৌন্দর্য বুকের ভেতরে গ্রহন করচ্ছিলাম। এদিকে পেমা আসার সময় হয়ে যাওয়ায় আমরা গুগুল ম্যাপ দেখে আবার হোটেলে ফিরে গেলাম।   

হোটেলের জানালা দিয়ে খেয়াল করলাম পেমা একদম সময় মত এসে হাজির। আমরা দ্রুত রেডি হয়ে নিচে চলে গেলাম। যেহেতু আজকে রাতেও এই হোটেলেই থাকবো তাই ব্যাগ ব্যাগেজ রেখেই গেলাম। গুগলিং করে পেমাকে থিম্পুর বেশ কিছু দর্শনীয় স্থানের লিস্ট দেখিয়ে বললাম, “যেভাবে সুবিধে হয় সেভাবেই যেন আমাদের অইসব স্থানে সিরিয়ালি নিয়ে যায়”

শুরুতেই পেমা আমাদের নিয়ে গেলো National Memorial Chhorten. এটি থিম্পুর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি বড় বৌদ্ধ উপসনা কেন্দ্র। ভুটানের ৩য় রাজা জিগমে দরজির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৭৪ সালে এই স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়। এখানে অনেক পেইন্টিং ও স্ট্যাচু আছে। রয়েছে হাজার হাজার কবুতর। এর ভেতরে প্রবেশ করলে ৩০০ রুপির টিকিট কাটতে হয়। ছাত্র আইডি কার্ড দেখালে ১৫০ রুপি নিবে টিকিট। আমরা ভেতরে প্রবেশ করিনি। বাহির থেকেই ছবি তুলে বিদায় নেই।

আমাদের এবারের গন্তব্য হচ্ছে বোদ্ধ পয়েন্ট। যা Buddha Dordenma নামে পরিচিত। বোদ্ধ পয়েন্টে রয়েছে বোদ্ধের একটা বিশাল স্ট্যাচু। নিচে থেকেই উপরে দেখা যাচ্ছি। সূর্যের আলোতে সোনালি কালার চকচক করচ্ছিল। পেমা আমাদের এক পাশে নামিয়ে বললো এটা দেখা শেষ হলে অপর পাশে সিড়ি দিয়ে যেন নেমে আসি, সে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। আমরা শুরুতেই চারপাশটা দেখে নিলাম। উপর থেকে পুরো থিম্পু শহর টা দেখা যাচ্ছিল। বোদ্ধ পয়েন্টের কাছে মুহূর্তগুলো ক্যামেরা বন্দি করে ভেতরের দিকটা দেখার জন্য গেলাম। ভেতরে জুতা ও ক্যাপ খুলে ঢুকতে হয় এবং সেখানে ফটোগ্রাফি নিষিদ্ধ। ছোট ছোট অনেক গুলো বোদ্ধ মূর্তি রয়েছে ভেতরে। শোকেচে সাজানো। পুরো ইন্টেরিওর ছিল সোনালী রঙয়ের।

ভেতরটা দেখা শেষ হলে বোদ্ধ পয়েন্টের সামনের দিকে বিশাল সিড়ি দিয়ে নিচের দিকে চলে গেলাম। এতই উঁচু সিড়ি যে নিচের দিক থেকে মনে হচ্ছিল এ যে আকাশের সাথে মিশে গেছে। এদিকে ক্ষিধা লেগে গেছে। নিচেই দেখি মমো নিয়ে বসে আছে বেশ কয়েকজন। সেখান থেকে ভেজিটেবল মমো খেয়ে নিলাম। ১০ রুপি নিয়েছিলো প্রতি পিস। গাড়িতে উঠার আগে পানি ও শুকনো কিছু খাবার নিয়ে নিলাম।

পেমা এবার আমাদের নিয়ে গেলো কাছেই সিটি ভিউ পয়েন্টে। পাখির চোখে থিম্পু শহর দেখার সুযোগ পেয়ে গেলাম। পুরো থিম্পু শহর টা এখান থেকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছিলো। অল্প কিসুক্ষন সময় এখানে কাটিয়ে আবার গাড়িতে উঠে বসলাম।

এবারের গন্তব্য Motithang Takin Preserve। এটা মূলত ছোট একটি চিড়িয়াখানা, এখানে  রয়েছে ভুটানের জাতীয় পশু তাকিন। প্রবেশ ফি ৩০০ রুপি। আমরা ভেতরে প্রবেশ করিনি। বাহিরের রাস্তাটা অসাধারণ লাগতেছিলো। গাছের হলুদ আর সজুব পাতার মিশ্রনে চারপাশটা দারুণ লাগছিলো। বেশ কিছুক্ষন রাস্তার পাশেই বড় পাথরে বসে থাকলাম, রাস্তা আর চারপাশের পরিবেশটা এতই ভাল্লাগতেছিলো যে দৌড়াতে ইচ্ছে হলো।

পেমা আমাদের নিয়ে একটু দূরেই আরেকটি সিটি ভিউ পয়েন্টে নামিয়ে দিলো। সেখান থেকেও পুরো থিম্পু শহর দেখা যাচ্ছিলো। এখানেও কিছু সময় কাটিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম।

Simtokha Dzong এর কাছেই উঁচু একটু পাহাড়ে আমাদের গাড়ি থামলো। পেমা আমাদের দেখালো অই যে এটাই সিমতোখা জং। ভুটানে এমন অনেক গুলো প্রাচীন জং রয়েছে। ভেতরে সবগুলোই একই রকম। Simtokha Dzong এ প্রবেশ করতে কোন টিকিট লাগে না। কোন জং দেখার ইচ্ছে হলে এইটা বিণামূল্যে দেখে নিতে পারেন। ১৬২৯ সালে যাবদ্রাং নাগাওয়াং নামগিয়াল, যিনি ভূটানকে একত্রিত করেছিলেন, এটি নির্মাণ করেছিলেন। ভূটানে এটি তাদের নির্মিত প্রথম প্রাসাদ। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ এবং  প্রাচীন বৌদ্ধ আশ্রম, বর্তমানে এটি জংখা ভাষা শিক্ষণের অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান।

Simtokha Dzong দেখা শেষ হলে পেমাকে বললাম আমাদেরকে  Royal Thimphu Golf Club এ নিয়ে যেতে। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম এখানে পর্যটকদের ডুকার অনুমতি আছে? পেমা জানালো সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে। সে আমাদের গলফ ক্লাবের সামনে নামিয়ে দিল। আমরা গেইট দিয়ে প্রবেশ করে দেখলাম ওখানের কয়েকজন কর্মচারি। তাঁদেরকে প্রবেশের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে জানালো ভেতরে প্রবেশ করতে ম্যানেজারের অনুমতি লাগবে। কিন্তু অফিসে গিয়ে ম্যানেজারকে খুঁজে পেলাম না। হয়ত কোন কাজে বাহিরে গিয়েছে। তখন অবস্থানরত কর্মচারিরা আমাদের একটা সীমানা দেখিয়ে বললো এর ভেতরে যেন না যাই, এর বাহিরে সমস্যা নেই। আমরা অইখানেই বেশী কিছুক্ষণ বসে থেকে ছবি তুলে বিদায় নিলাম। বিকেলের সময়টা গলফ ক্লাবের আশে পাশে কাটানোর জন্য পারফেক্ট একটা জায়গা।

যেহেতু আজকে ভুটানে ছুটির দিন তাই বড় মার্কেট গুলো সব বন্ধ। জানতে পারলাম আজকে লোকাল ফার্মাস মার্কেট খোলা। পেমা আমাদের ফার্মার্স মার্কেটে নিয়ে গেলো। যাওয়ার পথে ট্যাক্সির ভেতর  থেকেই ভুটানের পার্লামেন্ট হাউজ ও রাজপ্রাসাদ ও ক্লক টাওয়ার দেখতে দেখতে গেলাম।

আমাদেরকে ফার্মারস মার্কেটে নামিয়ে দিয়ে পেমা অপেক্ষা করতে লাগলো। এটা Centenary Farmers Market  নামে পরিচিত। আমরা মার্কেট টা ঘুরে দেখলাম। এখানে ছোট বড় অনেকগুলো মুদির দোকান ও পাশেই বিশাল শাক সবজি ও ফলমূলের দোতলা কাচাবাজার। কাঁচাবাজার থেকে আমরা আপেল্, কমলা কিনে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম।

পেমা আমাদের হোটেলে ড্রপ করে আজকের মত বিদায় নিয়ে চলে গেলো। দুপুরের মধ্যেই আমাদের থিম্পু ভ্রমণ শেষ হয়ে যায়। হোটেলে ফিরেই ফ্রেশ হয়ে কিছু ফল খেয়ে নিলাম। সাথের দুইজনের এখানের লোকাল খাবার খেতে একটু সমস্যা হচ্ছিল তাই ফল দিয়েই চালিয়ে নিলাম দুপুরের খাবার। এরপর ক্লান্ত দেহে ২/৩ ঘন্টা ঘুমিয়ে নিলাম। যদিও আমার কাছেই ভালই লাগছিলো লোকাল খাবারগুলো।

ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ রুমেই আড্ডা দিয়ে বিকেলের থিম্পু শহর দেখার জন্য বের হই। সকালে যেই দিকে গিয়েছিলাম এবার তার ঠিক উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করলাম। হাটতে হাঁটতে যখন সন্ধা ঘনিয়ে এলো খেয়াল করলাম আমরা আবার অই ফার্মারস মার্কেটের কাছেই চলে গেলাম। মার্কেটের সাম্নের দিকে রাস্তার পাশ দিয়ে বসে গেছে থিম্পু নদী। এবার নদীর একদম কাছে নামার সুযোগ পেয়ে গেলাম। থিম্পু নদীর তীরে কিসুক্ষন সময় কাটিয়ে এর পাশ দিয়ে হেঁটে সামা্ন্য এগিয়ে দেখি সুন্দর একটা সেতু। সেতু উপর ছোট একটা লোকাল মার্কেট। সেখানে জুতা ও কাপর বিক্রি হচ্ছে। নদীর অপর পাশটা থেকে গোধূলি লগ্নে সুন্দর লাগছিলো চারপাশটা।

আবার সেতু পার হয়ে চলে গেলাম ফার্মারস মার্কেটে। এবারো বেশী করে আপেল, কমলা কিনে নিলাম রাতের জন্য। আর সাথে নিলাম মুড়ি, পেঁয়াজ, কাচা মরিচ, আদা। প্লান হচ্ছে রুমে গিয়ে মুড়ি মাখা বানাবো। এছাড়াও মুদির দোকান থেকে কফি কিনে নিলাম। এবার হাঁটা দিলাম সোজা হোটেলের উদ্দেশ্যে। ম্যাপ দেখে সহজেই পৌঁছে গেলাম।

হোটেলে পৌঁছেই সাথে দুইজনকে জিজ্ঞেস করলাম রাতে কী খাবে? তারা কোনভাবেই রেস্টুরেন্টের খাবার খেতে রাজি না। কেমন নাকি গন্ধ করে। এদিকে নতুন একটা দেশে আসলাম আর এখানকার খাবার চেখে না দেখলে কি হয়? আমি ইন্টারকম থেকে রেস্টুরেন্তে কল দিয়ে বললাম একটা ভেজিটেবল চওমিন দিয়ে যেতে। দাম বল্লো ৯০ রুপি। অর্ডারের ৩০ মিনিটের মধ্যেই রুমে এসে দিয়ে গেলো। সাথের দুইজনকে বলার পর সামান্য একটু মুখে দিয়ে আর খাইতে পারলো না। তাই পুরোটাই আমি একাই সাভার করলাম। আমার কাছে ভালই লেগেছে। এর পর বাহির থেকে কিনে আনা ফ্রেশ কমলা, আপেল খেয়ে স্পেশাল মুড়ি মাখা বানাইলাম। দেশের বাহিরে এসেও দেশি স্টাইলে মুড়ি মাখা। ব্যাপারটা মনে রাখার মত ছিল।

আজকেই এই হোটেলের শেষ রাত। কাল আমাদের প্লান পুনাখা শহর দেখে ফোবজিখা ভ্যালিতে রাত্রি যাপন। এই জন্য সকালে অইসব শহরে যাওয়ার পার্মিশন নিতে হবে। আজকে ছুটির দিন থাকায় পার্মিশন অফিস বন্ধ ছিল। তাই বাধ্য হয়েই কালকের অপেক্ষা করা লাগলো। যদিও আজকে নিয়ে নিতে পারলে কাল আগে ভাগেই রওনা দেওয়ার একটা সুযোগ ছিল। পেমা আমাদের জানিয়েছিল ও নিজেই পার্মিশন নেওয়ার কাজটা করে দিবে। আমাদের কিছুই করতে হবে না। সময় লাগতে পারে ২ ঘন্টার মত।

সবাই বেশ অনেক্ষন আড্ডা দিয়ে, নিজেদের মত সময় কাটিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম সেদিনের মত।

ভুটান ভ্রমণের অন্যান্য পর্বসমূহঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *