ভুটান ট্যুর প্লান, গাড়ি, থাকা খাওয়া, খরচ ও বিশেষ টিপস: সুখী মানুষের দেশে (বিশেষ পর্ব)

ভুটান ট্যুর প্লান, গাড়ি, থাকা খাওয়া, খরচ ও বিশেষ টিপস: সুখী মানুষের দেশে (বিশেষ পর্ব)

বজ্র ড্রাগন ও সুখী মানুষের দেশ হিসেবে পচিরিত ভুটান ভ্রমণের জন্য প্রয়োজন একটি সুন্দর পরিকল্পনা। আজকে আমার ভুটান ভ্রমনের অভিজ্ঞতার আলোকে ট্যুর প্লান, যাতায়াতের জন্য গাড়ি, থাকা খাওয়া, খরচ, সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর ও অন্যান্য ব্যাপারগুলো শেয়ার করার চেস্টা করবো।

ভুটান ভ্রমণ প্লান – কিভাবে সাজাবেন ট্যুর?

নিচে আমার ভ্রমণ প্লান শেয়ার করা হলো: (৫ রাত ৬ দিন)

১ম দিনঃ (২১ ডিসেম্বর, শনিবার)
-বুড়িমারি/চেংড়াবান্ধা বর্ডার থেকে – জয়গাঁ/ ফুটশোলিং বর্ডার (সময় লাগবেঃ ২.৩০/৩ ঘন্টা)
-জয়গাঁ/ফুটশোলিং বর্ডার থেকে – থিম্পু (সময় লাগবেঃ ৫/৬ ঘন্টা
-রাতে থিম্পুতে থাকা

সড়ক পথে ভুটান ভ্রমণ – ঢাকা টু থিম্পু: সুখী মানুষের দেশে

২য় দিনঃ (২২ ডিসেম্বর, রবিবার)
-থিম্পুর দর্শনীয় স্থান দেখা

  • National Memorial Chorten*** (টিকেট-৩০০ রুপি)
  • Buddha Dordenma***
  • City View Point***
  • Motithang Takin Preserve*** (টিকেট-৩০০ রুপি)
  • Trashi Chho Dzong
  • Centenary Farmers Market ( Weekend Market )**
  • Handicrafts Market
  • National Library
  • Clock Tower Square**
  • The Folk Heritage Museum
  • Simtokha Dzong*
  • Pirlament House
  • Royal thimphu golf club**
  • Thimpu Chu (River)**
  • Archery playground
  • Football Stadium

-রাতে থিম্পুতে থাকা

ভুটানের রাজধানী থিম্পু ভ্রমণ: সুখী মানুষের দেশে

৩য় দিনঃ (২৩ ডিসেম্বর, সোমবার)
-থিম্পু ইমিগ্রেশন অফিস থেকে পুনাখা ও ফোবজিখা যাওয়ার পার্নিশন নেওয়া)। (সময় লাগবে ২ ঘন্টা)
-পুনাখার উদ্দেশে যাত্রা
-পুনাখার দর্শনীয় স্থান দেখা

  • দাচুলা পাস
  • চিমি লাখাং মন্দির
  • পুনাখা জং
  • সাসপেনশন ব্রিজ
  • তালো মনেস্ট্রি -Talo Monastery
  • Mo Chuu & Pho Chhu নদী
  • জিগমে দর্জি ন্যাশনাল পার্ক

-ফোবজিখা পৌছানো
-রাতে ফোবজিখা ফার্ম হাউজে থাকা।
নোটঃ পুনাখার অন্যতম আকর্ষন নদীতে রাফটিং করা। প্লান থাকলে অই অনুযায়ী প্লান সাজাতে হবে। এছাড়া উপরের সবগুলো স্পট কভার করতে চাইলে রাতে পুনাখা থাকতে হবে।

ভুটানের পুনাখা ভ্রমণ: সুখী মানুষের দেশে (৩য় পর্ব)

৪র্থ দিন:( ২৪ ডিসেম্বর, মংগলবার)
-সকালে ফার্ম হাউজের আশপাশে হেঁটে দেখা
-Black Necked Crane Information Centre (টিকেট ১০০ রুপি)
-Gangtey Nature Trails and Hikes (এক দের ঘন্টা হেঁটে যাওয়া অসম্ভব সুন্দর প্রাকৃতিক রাস্তা)
-Gangtey Monastery (গ্যাংটে ন্যাচার ট্রেইল দিয়ে হেটে এখানে পৌছাতে হয়, সরাসরি গাড়ি দিয়েও পৌছানো যায়)
-View Point (Gangtey Monestery থেকে গাড়ি দিয়ে ফিরে আসার সময় দেখতে পাবেন)
-পারোর উদ্দেশ্যে যাত্রা
-রাতে পারো থাকা

৫ম দিন, (২৫ ডিসেম্বর, বুধবার)
-খুব সকালে পায়ে হেটে হোটেলের আশে পাশে দেখা
-টাইগার নেস্ট হাইক (হেটে পৌছতে ৩ ঘন্টা লাগবে, নেমে আসতে দের ঘন্টা)
-পারো মার্কেটে কেনাকাটা
-রাতে পারো থাকা
নোটঃ পারো ও হ্যা ভ্যালির মাঝখানে অবস্থিত অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র চেলালা পাস যেতে চাইলে পারোতে আরো একদিন থাকতে হবে।

৬ষ্ঠ দিন, (২৬ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার)
-খুব সকালে ফুটশোলিং এর উদ্দেশ্যে হোটেল ত্যাগ
-পথে পারো এয়ারপোর্ট ভিউ পয়েন্ট দেখা
-ফুটশোলিং/জয়গাঁ পৌছে ভুটাণ ও ভারত অংশে ইমিগ্রেশনে শেষ করা। (পারো থেকে আসতে ৪/৫ ঘন্টা লাগে)
-জয়গাঁতে বিসমিল্লাহ হোটেলে গরুর মাংস দিয়ে খাওয়া দাওয়া
-জয়গাঁ থেকে চেংরাবান্দা/বুড়িমারি বর্ডার পৌছানো (আড়াই ঘন্টার পথ)
-ইমিগ্রেশন শেষ করে বাংলাদেশে প্রবেশ (বর্ডার সন্ধ্যা ৬ টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়)
-বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা

উপরের প্লান অনুযায়ী ট্যুর প্লান সাজাতে পারেন কিংবা গুগল থেকে সার্চ করে আইডিয়া নিয়ে নিজের মত সাজাতে পারেন।

ভুটানে যাতায়াতের মাধ্যম কী?

ভুটানে যাতায়াতের জন্য ৪ জন ও ৮ জনের ট্যাক্সি ও জীপ পাওয়া যায়। এছাড়া রয়েছে টুরিস্ট বাস। সবেচেয়ে ভালো হয় লোক অনুযায়ী ট্যাক্সি কিংবা জীপ ভাড়া করে নেওয়া।
আমরা ৪ জনের ট্যাক্সি নিয়েছিলাম। যদিও আমরা ৩ জন ছিলাম।
আমাদের টুর গাইড ৩ ধরনের গাড়ির অফার করেছিল।
Suzuki Wagoner (4 Seat, 2800 Rupee, Per Day)
Hyundai santafe: (4 Seat 3000 Rupee, Per Day)
Creata (SUV): (4 Seat, 3500 Rupee, Per Day)

আমরা নিয়েছিলাম Hyundai santafe: 3000 Rupee, Per Day)

এছাড়াও ৭/৮ জনের জন্য Hi Ace কিংবা বড় গাড়িও আছে। ভাড়া দিন প্রতি ৪৫০০ এর মত সম্ভবত)

একলা হলে টুরিস্ট বাসেও ঘুরা যায়, তবে বাসে সব স্পটে যাওয়া যায় না৷ শুধু মূল শহরে ও বেশ কিছু স্পটে যাওয়া যায়) ভাড়া জায়গা ভেদে ১০০/২০০ রুপির মত পরবে। এক শহর থেকে আরেক শহর যেতে৷

ভুটানে থাকবেন কোথায়?

থাকার জন্য আমরা আগে থেকেই ফেসবুকে এক ভুটানি ড্রাইভারের মাধ্যমে চুক্তি করে নিয়েছিলাম। প্রতি রাত ৩ জনের জন্য ১৮০০ রুপিতে (৩* মানের হোটেল দিয়েছিলো আমাদের)
সীজনে গেলে আগে থেকে বুক করে যাওয়া ভালো। অফ সীজনে গিয়েও হোটেল ম্যানেজ করতে পারবেন সহজে। পারোতে কম দামে ভাল হোটেল পাবেন৷ থিম্পু, পুনাখা ও ফোবজিখাতে রেট একটু বেশি৷

ভুটানে খাবেন কী?

খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা প্রায় সব হোটেলেই পেয়ে যাবেন। ভুটানের অধিকাংশ মানুষ বোদ্ধ ধর্মের অনুসারি এছাড়াও খ্রিস্টান ও কিছু হিন্দু রয়েছে। কিন্তু মুসলিম নেই৷ তাই হালাল খাবারের জন্য মাংশ এভয়েড করা ভালো৷ ভুটানে সব ধরনের প্রানী হত্যা নিষেধ এমনকি মাছ ধরাও নিষেধ। তবে তারা এইগুলো ইন্ডিয়া থেকে ইম্পোর্ট করে।
এখানে বেশ কিছু ভেজ রেস্টুরেন্ট পাবেন সেগুলোতে খাওয়া দাওয়া করতে পারবেন। কিংবা প্রায় সকল হোটেলেই আলাদা ভেজ আইটেম পাওয়া যায়৷

খাবারের জন্য দৈনিক কমপক্ষে ৪০০ রুপি বাজেট রাখা উচিত। এবং কমপক্ষে একবার হলেও ওদের ট্র্যাডিশনাল ডিশ (রেড রাইস, এমা দাতসি, কেওয়া দাতসি, শামু দাতসি ও বেশ কিছু আইটেম) ট্রাই করা উচিত৷ ফোবজিখাতে ট্রাই করা যেতে পারে। সেখানে একদম আসল ফ্লেবারটা পাবেন৷ অর্ডার করার সময় বলে দিবেন কোন মাংস যেন না ইউজ করে।

ভুটান ভ্রমণে খরচ কেমন?

-ঢাকা টু বুড়িমারিঃ (৬৫০, নন এসি/ ৮৫০, এসি
-বর্ডার স্পিডমানিঃ (বাংলাদেশ অংশে ৪০০, ইন্ডিয়ান অংশে, ২০০) আসা যাওয়া মিলিয়ে।
-চেংড়াবান্ধা থেকে জয়গাঁঃ (আসা যাওয়া ৪ সিটের ট্যাক্সি ভাড়াঃ(১৫০০+১৫০০= ৩০০০ রুপি)
-প্রতিদিনের ট্যাক্সি ভাড়া ৪ জনের সিটেরঃ ৩০০০ রুপি।
Suzuki Wagoner (4 Seat, 2800 Rupee, Per Day)
Hyundai santafe: (4 Seat 3000 Rupee, Per Day)
Creata (SUV): (4 Seat, 3500 Rupee, Per Day)
-হোটেল ভাড়াঃ আমাদের ৩ জনের প্রতি রাতের জন্য ১৮০০ রুপি।
-খাওয়াঃ দিন প্রতি ৪০০ রুপি
এছাড়াও বিভিন্ন স্পটের টিকিট: (টাইগার নেস্ট: ৫০০ রুপি, পুনাখা জং: ৩০০ রুপি, তাকিন প্রিজার্ভ- ৩০০ রুপি, থিম্পুতে National Memorial Chhorten: ৩০০ রুপি, ফোবজিখাতে Black Necked Crane Information Centre: ১০০ রুপি]

ভুটান ভ্রমণ নিয়ে বিশেষ কিছু কথা:

  • ভুটানে অনেক গুলো জং আছে। প্রায় সবগুলো জং এর ভেতরে প্রায় একই রকম। টিকিট কেটে দেখতে চাইলে অবশ্যই পুনাখা জং দেখবেন। এটা সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন। ভেতরে ভিবিন্ন কারুকাজ, তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য৷ তবেএইগুলো না দেখতে চাইলে ভেতরে না গিয়ে বাহিরে থেকে ছবি তুলে চলে আসতে পারেন। এছাড়া থিম্পুর সিমতোখা জং ফ্রী৷ সেটাও দেখেও একটা আইডিয়া নিতে পারেন।
  • শনি ও রবিবার ভুটানের সরকারি ছুটির দিন৷ তাই ঐদিন থিম্পু পার্মিশন অফিস বন্ধ থাকে। তবে জয়গাঁ/ফুটশোলিং ইমিগ্রেশন খোলা থাকে।
  • এই দুইদিন থিম্পু পার্মিশন অফিস বন্ধ থাকায় পুনাখা, ফোবজিখা কিংবা অন্যান্য স্থানের অনুমতি নিতে পারবেন না। তাই টুর প্লান করার সময় এটা মাথায় রাখা উচিত৷
  • ভুটান-ভারত বর্ডার ফুটশোলিং থেকে শুধু থিম্পু ও পারোর পার্মিশন দেয়।
  • ফুটশোলিং থেকে থিম্পু যেতে পারো হয়ে যেতে হয়। অর্থ্যাৎ পারো থেকে ফুটশোলিং এর দুরত্ব কম৷
  • পারোর অন্যতম দর্শনীয় স্থান চেলালা পাস দেখতে চাইলে অতিরিক্ত একদিন পারোতে থাকতে হবে৷ আমরা চেলালা পাস প্লান থেকে বাদ দিয়েছিলাম।
  • ভুটানে এটিএম বুথ সবসময় কাজ করে না। আর বুথে টাকা বেশী থাকে না তাই ভুটানের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে চাইলে এই ব্যাপারে খেয়াল রাখবেন।
  • মোবাইল চার্জ দিতে একটি ইউনিভার্সাল অ্যাডাপ্টার সাথে রাখুন (ভুটানের অধিকাংশ হোটেলে ৩ পয়েন্টের গোল সকেট থাকে)
  • ভুটানে কম খরচে ভ্রমণ করতে হলে অফ সিজনে যাওয়া ভালো।
  • ভুটানে ধূমপান নিষিদ্ধ।
  • যেকোনো স্থান বিশেষ করে জং, মন্দির বা কোনও ধর্মীয় স্থ্যান পরিদর্শনের সময় সেখানের নিয়ম মেনে চলার সবসময় চেষ্টা করবেন।
  • হা ভ্যালি ও বুমথাং যেতে চাইলে থিম্পু থেকে আগেই অনুমতি নিতে হবে৷
  • উঁচু পাহাড়ি এলাকায় আঁকা বাঁকা রাস্তায় গাড়িতে চলাচল করার সময় মাথা ব্যাথা করতে পারে এবং বমি ভাব আসতে পারে। তাই গাড়িতে চড়ার সময় খাবার কম খাওয়া উচিত।
  • ভুটান পরিষ্কার পরিছন্ন দেশ এবং যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা নিষেধ।
  • সত্যি বলতে ভুটানে আসলে আলাদা করে দেখার কিছু নাই। টুরিস্ট স্পটগুলো আপনার কাছে মনে হতে পারে সব একই রকম। কিন্তু পুরো ভুটানটাই হচ্ছে দেখার মত। ভুটান গেট পার হবার পরেই আপনার মনে হবে আপনি হয়তো অন্য কোথাও চলে এসেছেন। ভ্রমণপ্রেমী মানুষের কাছে এখানকার প্রতিটা মুহূর্তই মনে হবে উপভোগ্য ।
  • ভুটান বর্ডার থেকে থিম্পু যেতে সময় লাগে ৫-৬ ঘণ্টা। পাহাড়ি রাস্তার উঁচু- নিচুতে যাদের সমস্যা হয় তাদের জন্য সামান্য কষ্ট হলেও রাস্তার যে ভিউ বা অনুভূতি পাবেন তা পুরো ট্রিপের বাড়তি পাওনা হিসাবে পাবেন। আর লম্বা জার্নিকে ছোট করতে চাইলে ভুটান বর্ডার (ফুটশোলিং)/ জয়গাতে একরাত বিশ্রাম নিয়ে পরদিন থেকে যাত্রা শুরু করতে পারেন।

ভুটান ভ্রমণ নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর

ভুটান যেতে কি ভিসা লাগবে?
আপনি যদি বাই রোড ভুটান যেতে চান তাহলে আপনার ইন্ডিয়ার ট্রানজিট ভিসা দরকার হবে । বাই এয়ার গেলে ইন্ডিয়ার ভিসা লাগবে না। ভুটান অন এরাইভাল ভিসা দিয়ে থাকে। শুধু পাসপোর্ট হলেই হবে।

ভুটান কতদিনের জন্য অন এরাইভাল ভিসা দেয়?
বাই রোডে ভারত হয়ে ভুটানে ঢোকার সময় ফুটশোলিং থেকে থিম্পু এবং পারো (Paro) ভ্রমণের জন্য সাত দিনের ভিসা দেয়। আপনি আরও বেশী দিন থাকতে চাইলে থিম্পু থেকে বাড়িয়ে নেয়ার সুযোগ থাকবে। উল্লেখ্য, থিম্পু এবং পারো ছাড়া অন্য কোথাও যেতে চাইলে তার জন্য আলাদা অনুমতি দরকার হয় যেটা থিম্পু ইমিগ্রেসন অফিস থেকে নিতে হবে।

ভুটান ভ্রমণের অন্যান্য পর্বসমূহঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *