টাইগার নেস্ট ট্রেকিং: সুখী মানুষের দেশ ভুটানের পারোতে (শেষ পর্ব)

টাইগার নেস্ট ট্রেকিং: সুখী মানুষের দেশ ভুটানের পারোতে (শেষ পর্ব)

টাইগার নেস্ট ট্রেকিং ভিডিও

আসসালামু আলাইকুম। ভুটান ভ্রমণের চতুর্থ ও শেষ পর্বে আপ্নাদের স্বাগত। এবারের পর্বে থাকছে ভুটানের অন্যতম প্রধান আকর্ষন টাইগার্স নেস্ট। সারাদিন ফোবজিখা ভ্যালিতে কাটিয়ে আমরা ছুটে চলি পারো শহরের দিকে। রাত ৮ টার দিকে আমরা আমাদের হোটেলে পৌছাই।

ভুটানে আজ আমাদের পঞ্চম দিন। আমরা আছি ভুটানের পারো শহরে। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৭২০০ ফিট। পারো একটি ঐতিহাসিক শহর। এখানে ছড়িয়ে আছে বোদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন পবিত্র স্থান এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা। এই পারোতেই ভূটানের একমাত্র আন্তর্জাতিক  বিমানবন্দর অবস্থিত।

Plane Taking off at Most Dangerous Airport in the World – Paro International Airport

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পারো নদীর তীরে চলে গেলাম। ভোরবেলা পারোর ফাঁকা রাস্তা ধরে কিছুক্ষন হাটাহাটি করে আবার হোটেলে ফিরে আসলাম। হোটেলের বারান্দায় কিছু সময় পায়চারি করতে করতেই আমাদের সকালের  নাস্তা রেডি হয়ে যায়।

আমাদের এবারের গন্তব্য টাইগার নেস্ট। পাহাড় চূড়ায় এক বিস্ময়ের নাম টাইগার্স নেস্ট। পারো শহর ঘুরতে আসা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে যদি কেউ টাইগার্স নেস্ট না দেখে। শান্ত, সুন্দর, সাজানো গোছানো ভুটানের পারো শহর। এই শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ টাইগার্স নেস্ট। নামের সঙ্গে বাঘ থাকলেও ধারেকাছে বাঘের টিকিটাও মিলবে না। এটি মূলত একটি মনেস্ট্রি। স্থানীয়রা টাইগার্স নেস্টকে তাক্তসাং বলে থাকে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা টাইগার্স নেস্ট দেখতে চাইলে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা ট্রেকিং করতে হবে। অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই টাইগার্স নেস্টের বেজ পয়েন্টে। ট্রেকিং যেখান থেকে শুরু হবে, সেখানে গিয়ে দেখি দেশ বিদেশের আরো অনেক পর্যটক। সবাই হাতে লাঠিসোটা নিয়ে ট্রেকিংয়ের জন্য তৈরি। আমরাও লাঠি নিয়ে তৈরি হলাম ট্রেকিংয়ের জন্য। এখানে ৫০ রুপিতে লাঠি ভাড়া পাওয়া যায়।

শুরু হয়ে যায় আমাদের টাইগার্স নেস্ট হাইকিং । আসুন জেনে নেই টাইগার নেস্টের গল্প। নামের সঙ্গে বাঘ থাকলেও ধারেকাছে বাঘের টিকিটাও মিলবে না। এটি মূলত একটি মনেস্ট্রি। স্থানীয়রা টাইগার্স নেস্টকে তাক্তসাং বলে থাকে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা টাইগার্স নেস্ট দেখতে চাইলে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা ট্রেকিং করতে হবে।

কথিত আছে, বহু বছর আগে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী পদ্মসম্ভব এক বাঘিনীর পিঠে চড়ে তিব্বত থেকে সোজা উড়ে এসেছিলেন এই পাহাড়ে। দীর্ঘ তিন মাস পাহাড়ের এক গুহায় তপস্যার পরে ভুটানের দুরাত্মাদের পরাস্ত করে পদ্মসম্ভব ফিরে যান তিব্বতে। ভুটানকে দিয়ে যান বৌদ্ধধর্ম। তিব্বতি ভাষায় তাকসাং মানে বাঘের গুহা বা টাইগার নেস্ট। ১৬৯২ সালে তেনজিং রাবগে ওই গুহায় তাকসাং বৌদ্ধমঠটি তৈরি করেছিলেন। ভুটানিদের বিশ্বাস, তেনজিংই পূর্বজন্মে ছিলেন পদ্মসম্ভব।

পাহাড়ের গা ধরে মঠে যাওয়ার প্রায় বারো কিলোমিটার পথ তৈরি হয়েছে মানুষের পায়ে পায়ে! বেশ চড়াই, এবড়োখেবড়ো, সংকীর্ণ রাস্তা। এক দিকে খাদ। চলার পথে এমন কিছু বাঁক আছে যে, আগে থেকে দেখা যায় না! ঘোড়ায় করে যাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। যে দেশের সরকার প্রকৃতি নিয়ে এত সচেতন, যে মঠ দেখতে রোজ শয়ে শয়ে পর্যটক আসেন, সেখানে ঠিকঠাক রাস্তা নেই কেন? প্রশ্নের উত্তর দিলেন স্থানীয় এক গাইড, ‘‘কষ্ট করে না গেলে পুণ্য মিলবে কেমন করে!’’

চড়াই-উতরাই পথ পেরোবার কষ্ট অনেকটাই কমিয়ে দেয় চারপাশের সবুজ প্রকৃতি। পাহাড়ি রাস্তা যেন সবুজে ঢাকা। সঙ্গে মেঘের লুকোচুরি। নাম না জানা কতই না গাছ! সেই গাছের ফাঁক দিয়ে মেঘ এসে উঁকি দিয়েই হারিয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত রকম সুন্দর প্রকৃতি এখানে। রাস্তার কোথাও সমতল, কোথাও পাহাড়। আবার কোথাও আবার  খাঁড়া । হাঁটতে হাঁটতে একে এক রূপকথার বন মনে হবে! জেদিকে চোখ যায় পাইন গাছের সারি। ঝরা পাতায় মোড়ানো রাস্তায় যেন পদচিহ্ন পড়েনি এর আগে! সুনসান নিরব পাইনের জঙ্গলে দাঁড়িয়ে মনে হলো ভুল করে বুঝি রূপকথার কোনও রাজ্যে এসে পড়েছি। এই যেন হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া রূপকথার রাজ্যে! পাহাড়ি পথের বেশ কয়েক জায়গায় দেখা যাবে রঙিন পতাকার মতো কাপড় টাঙিয়ে রাখা। এটি প্রার্থনার একটি অংশ। মাঝপথে একটি ক্যাফেটেরিয়া রয়েছে। প্রায় ৩ ঘন্টা ট্রেকিং করার পর আমরা পৌছে গেলাম টাইগার নেস্টের একদম কাছে। সেখান গিয়ে মনে হলো পুরো ৩ ঘন্টা ট্রেকিং এর ক্লান্তি যেন সৌন্দর্যের কাছে হার মানলো।

এবার ফেরার পালা। ফেরার পথে সাথে থাকা খাবার খেয়ে নিলাম। একটু পর পর রাস্তার পাশে রয়েছে  ঝর্না থেকে আসা পানি পান করার ব্যবস্থা। একদম নিচে বেজ পয়েন্টে কেনাকাটার জন্য রয়েছে হ্যান্ডীক্র্যাফট শপ। তো আজ এ পর্যন্তই। আবারও কথা হবে নতুন কোন স্থানে। সেই পর্যন্ত ভালো থাকুন।

ভুটান ভ্রমণের অন্যান্য পর্বসমূহঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *